মাদ্রাসার রেজাল্ট শিট ও মার্কশিট তৈরির নিয়ম
রেজাল্ট শিট তৈরির কাজ চার ধাপে শেষ হয়: প্রথমে শ্রেণিবারী বিষয় ও পূর্ণমান ঠিক করা, তারপর প্রতি বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর তোলা, তারপর মোট, গড় ও মেধাস্থান বের করা এবং শেষে শিক্ষার্থীপ্রতি মার্কশিট ছাপানো। হাতে করলে এই কাজে একটি মাদ্রাসার সাত থেকে দশ দিন লাগে, আর সফটওয়্যারে নম্বর তোলা শেষ হলেই বাকি তিনটি ধাপ নিজে থেকেই হয়ে যায়।

রেজাল্ট শিট তৈরির আগে কী কী ঠিক করতে হবে?
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নম্বর তোলা শুরু করলে দেরি হয়ে যায়। পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রতি শ্রেণির জন্য তিনটি জিনিস লিখিতভাবে ঠিক করে রাখুন: কোন কোন বিষয় পরীক্ষায় থাকবে, প্রতি বিষয়ের পূর্ণমান কত, এবং পাস নম্বর কত। এই তিনটি ঠিক থাকলে পরে কেউ প্রশ্ন তুললে দলিল দেখানো যায়। প্রতিটি মাদ্রাসা নিজের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী বিষয় ও মান ঠিক করে, নিচের ছকটি শুধু একটি উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হলো।
| বিষয় | লিখিত | মৈখিক বা তালাফ্ফুজ | পূর্ণমান | পাস নম্বর |
|---|---|---|---|---|
| কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত | ৩০ | ২০ | ৫০ | ২৫ |
| হিফজ সবক ও আমুখতা | ০ | ৫০ | ৫০ | ২৫ |
| আরবি | ৮০ | ২০ | ১০০ | ৪০ |
| ফিকহ | ৮০ | ২০ | ১০০ | ৪০ |
| বাংলা | ১০০ | ০ | ১০০ | ৪০ |
| ইংরেজি | ১০০ | ০ | ১০০ | ৪০ |
| গণিত | ১০০ | ০ | ১০০ | ৪০ |
ছকটি তৈরি হয়ে গেলে সব শিক্ষককে একটি করে কপি দিন। অনেক সময় একজন শিক্ষক ১০০ নম্বরে খাতা দেখেন আর অন্যজন ৫০ নম্বরে, তখন মোট নম্বর মেলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
প্রাপ্ত নম্বর থেকে মেধাতালিকা কীভাবে বের করবেন?
মেধাতালিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি তর্ক হয়, কারণ নিয়মটি আগে থেকে বলা থাকে না। পরীক্ষার আগেই ঠিক করে নিন মেধাস্থান মোট নম্বরের ভিত্তিতে হবে নাকি গড়ের ভিত্তিতে, আর সমান নম্বর হলে কোন বিষয় দেখে আগে পিছে করা হবে।
- প্রতি শিক্ষার্থীর প্রতিটি বিষয়ের লিখিত ও মৈখিক নম্বর যোগ করে বিষয়ভিত্তিক প্রাপ্ত নম্বর লিখুন।
- সব বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে মোট নম্বর বের করুন।
- মোট নম্বরকে মোট পূর্ণমান দিয়ে ভাগ করে ১০০ দিয়ে গুণ করলে শতকরা হার পাবেন।
- যেসব শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে পাস নম্বর পায়নি তাদের আলাদা দাগ দিয়ে রাখুন।
- উত্তীর্ণদের মোট নম্বর অনুযায়ী বড় থেকে ছোট ক্রমে সাজিয়ে মেধাস্থান দিন।
- সমান নম্বর হলে আগে থেকে ঠিক করা বিষয় (যেমন আরবি বা কুরআন) দেখে পার্থক্য করুন।
- চূড়ান্ত করার আগে অন্তত দুইজন শিক্ষক দিয়ে যোগ মিলিয়ে নিন।
মার্কশিটে কী কী থাকা দরকার?
অভিভাবকের হাতে যাওয়া মার্কশিটটিই মাদ্রাসার কাজের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ। তাই এতে প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও লোগো, শিক্ষার্থীর নাম, পিতার নাম, শ্রেণি, রোল বা আইডি, পরীক্ষার নাম ও সাল, বিষয়ভিত্তিক পূর্ণমান ও প্রাপ্ত নম্বর, মোট নম্বর, শতকরা হার, মেধাস্থান, ফলাফল উত্তীর্ণ নাকি অনুত্তীর্ণ, সাথে উপস্থিতির হার এবং শিক্ষকের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য রাখা উচিত। নিচে মুহতামিম ও শ্রেণিশিক্ষকের স্বাক্ষরের জায়গা রাখুন।
হিফজ বিভাগের মার্কশিটে শুধু নম্বর দিলে অভিভাবক পুরো ছবি পান না। তার সাথে কত পারা শেষ হয়েছে, চলতি সবক কোথায় এবং আমুখতার অবস্থা কেমন তাও লেখা থাকলে মার্কশিটটি অনেক বেশি অর্থবহ হয়। এই তথ্যগুলো কীভাবে নিয়মিত রাখতে হয় তা হিফজ বিভাগের দৈনিক রুটিন ও রেকর্ড লেখায় বিস্তারিত আছে।
হাতে রেজাল্ট তৈরি করলে সমস্যা কোথায়?
- একজন শিক্ষার্থীর নম্বর ভুল ঘরে বসলে পুরো মেধাতালিকা বদলে যায়।
- যোগের ভুল ধরা পড়ে মার্কশিট ছাপার পর, তখন সংশোধন করতে বিব্রত হতে হয়।
- একই নামের দুই শিক্ষার্থীর নম্বর উল্টাপাল্টা হয়ে যায়।
- শাখা বা শিফট একাধিক হলে রেজাল্ট একসাথে মিলাতে অনেক সময় লাগে।
- পুরনো বছরের রেজাল্ট পরে কেউ চাইলে খুঁজে পাওয়া যায় না।
- প্রতিটি মার্কশিট হাতে লেখার কারণে শিক্ষকদের অনেক দিন পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়।
নম্বর তোলার সময় কোন ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়?
বেশিরভাগ মাদ্রাসায় রেজাল্ট নিয়ে যেসব অভিযোগ আসে, তার মূলে কোনো অসততা থাকে না, থাকে তাড়াহুড়ো করে করা লেখার ভুল। সবচেয়ে বেশি হয় এক শিক্ষার্থীর নম্বর অন্য শিক্ষার্থীর ঘরে বসানো, কারণ খাতার সারি এক ঘর সরে গেছে। এরপরেই আসে মৈখিক নম্বর যোগ করতে ভুলে যাওয়া, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর ঘরে শূন্য না লেখা এবং একই খাতা দুইবার গণনা করা। এই চারটি ভুল এড়ানোর সহজ উপায় হলো শ্রেণির হাজিরা তালিকার ক্রম ধরে নম্বর তোলা এবং এক বিষয় শেষ হলে সেই বিষয়ের মোট যোগ করে খাতার সংখ্যার সাথে মিলিয়ে নেওয়া।
আরেকটি বিষয় অনেক মাদ্রাসা মিস করে: অনুপস্থিত ও বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের পার্থক্য। যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসেনি তার ঘরে অনুপস্থিত লিখুন, শূন্য নয়। শূন্য লিখলে গড় নেমে যায় এবং পরে অভিভাবককে ব্যাখ্যা দিতে হয়।
রেজাল্ট প্রকাশের পর কোন কাজগুলো বাকি থাকে?
ফলাফল প্রকাশই শেষ কাজ নয়। প্রথমে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের পরের শ্রেণিতে তুলতে হবে এবং নতুন শ্রেণির বেতন কাঠামো ঠিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনুত্তীর্ণ বা দুর্বল শিক্ষার্থীদের তালিকা ধরে অভিভাবকদের সাথে আলাদা করে কথা বলা দরকার। তৃতীয়ত, বিষয়ভিত্তিক গড় দেখলে বোঝা যায় কোন বিষয়ে পুরো শ্রেণিই পিছিয়ে আছে, যা পরের সেমিস্টারে বাড়তি ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। চতুর্থত, পুরো পরীক্ষার একটি সারসংক্ষেপ কমিটিকে দিন, যেখানে অংশগ্রহণকারী সংখ্যা, উত্তীর্ণের হার এবং শ্রেণিবারী গড় থাকবে।
সফটওয়্যারে রেজাল্ট তৈরি করলে কী সুবিধা?
সফটওয়্যারে কাজটি উল্টো দিক থেকে শুরু হয়। আগে একবার শ্রেণি ও বিষয়ের পূর্ণমান সেট করে দিতে হয়, তারপর শিক্ষকরা শুধু প্রাপ্ত নম্বর বসান। মোট, গড়, শতকরা হার, উত্তীর্ণ অনুত্তীর্ণ এবং মেধাস্থান সফটওয়্যার নিজেই বের করে। ফলে যোগের ভুল থাকে না এবং রেজাল্ট প্রকাশের দিনই শাখা ও শিফট মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়। মার্কশিট ডিজাইন একবার ঠিক করা থাকলে পুরো শ্রেণির মার্কশিট একসাথে ছাপানো যায়। বিস্তারিত পরীক্ষা ও রেজাল্ট ব্যবস্থাপনা পাতায় দেখতে পারেন, আর সনদ বা আইডি কার্ড ছাপানোর ব্যবস্থা দেখতে আইডি কার্ড ও সনদ প্রিন্ট পাতায় যান।
পরীক্ষার ফলাফল দ্রুত প্রকাশ করতে চান?
ছবক মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে নম্বর তোলা শেষ হলেই মার্কশিট, মেধাতালিকা ও শ্রেণির ফলাফল শিট তৈরি। ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপে জানালে বিনামূল্যে ডেমো দেখানো হবে।