চাঁদা ও দান আদায়ের রশিদ ও হিসাব কীভাবে রাখবেন
চাঁদা বা দান আদায়ের সময় প্রতিটি টাকার বিপরীতে ক্রমিক নম্বরসহ দুই কপি রশিদ দিতে হবে এবং সেই রশিদ থেকেই সরাসরি হিসাবের খাতায় এন্ট্রি হতে হবে। রশিদে দাতার নাম, মোবাইল নম্বর, তারিখ, খাত, টাকার অংক ও কথা, আদায়কারীর নাম এবং প্রতিষ্ঠানের সীল থাকলে পরে কখনো হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না।

রশিদে কোন কোন তথ্য থাকা জরুরি?
অনেক মাদ্রাসায় রশিদ বইয়ে শুধু টাকার অংক আর একটি স্বাক্ষর থাকে। এতে তাৎক্ষণিক কাজ চলে গেলেও ছয় মাস পর কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন এই টাকা কোন খাতে নেওয়া হয়েছিল, তখন উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নিচের তথ্যগুলো রশিদে থাকলে সেই সমস্যা হয় না।
| তথ্য | কেন দরকার |
|---|---|
| ক্রমিক বা রশিদ নম্বর | পরে খাতার এন্ট্রির সাথে মিলাতে হলে এই নম্বরই প্রধান সূত্র |
| তারিখ | কোন মাস ও কোন অর্থবছরের হিসাবে পড়বে তা ঠিক হয় |
| দাতার পূর্ণ নাম ও ঠিকানা | একই নামের একাধিক দাতা থাকলে গুলিয়ে যায় না |
| মোবাইল নম্বর | পরবর্তীতে কৃতজ্ঞতা জানাতে বা হিসাব জানাতে কাজে লাগে |
| খাতের নাম | সাধারণ দান, লিল্লাহ বোর্ডিং, নির্মাণ তহবিল যাই হোক স্পষ্ট লিখতে হবে |
| টাকার অংক ও কথায় | অংক পরিবর্তনের সুযোগ বন্ধ হয় |
| আদায়ের মাধ্যম | নগদ, বিকাশ, নগদ অ্যাকাউন্ট বা ব্যাংক জমা আলাদা করা যায় |
| আদায়কারীর নাম ও স্বাক্ষর | কার কাছে টাকা জমা হয়েছে তার দায়িত্ব নির্ধারিত হয় |
| প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও সীল | রশিদের গ্রহণযোগ্যতা থাকে |
রশিদ সবসময় দুই কপি রাখুন। এক কপি দাতাকে দিন, আরেক কপি বইয়েই থাকবে। রশিদ বই বাতিল করতে হলে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলবেন না, বরং কেটে বাতিল লিখে বইয়েই রাখুন, নাহলে ক্রমিক নম্বরে ফাঁক তৈরি হয় এবং সেই ফাঁক নিয়েই পরে প্রশ্ন ওঠে।
দাতার রেকর্ড কীভাবে রাখলে কাজে লাগে?
মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো নিয়মিত দাতাদের তালিকা। অথচ অনেক প্রতিষ্ঠানে এই তালিকা একজন নির্দিষ্ট মানুষের মুখস্থ থাকে, লেখা থাকে না। তিনি অন্যত্র চলে গেলে সম্পর্কটাও চলে যায়। তাই প্রতিজন দাতার জন্য কমপক্ষে নাম, মোবাইল, এলাকা, কোন খাতে দিতে আগ্রহী এবং কখন কত দিয়েছেন তার তারিখওয়ারি রেকর্ড রাখুন।
এই রেকর্ড তিনটি কাজে লাগে। এক, রমজান বা কোরবানির আগে কাদের কাছে যাওয়া দরকার তা সহজে বের করা যায়। দুই, কোনো দাতা অনেক দিন ধরে নেই তা ধরা পড়লে খোঁজ নেওয়া যায়। তিন, বছর শেষে দাতাকে তার দেওয়া টাকার একটি সারসংক্ষেপ দিলে আস্থা অনেক বেড়ে যায়।
প্রতিনিধি দিয়ে চাঁদা তুললে হিসাব কীভাবে নিরাপদ রাখবেন?
মাঠ পর্যায়ে কালেক্টর বা প্রতিনিধি দিয়ে চাঁদা তোলাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির জায়গা, কারণ টাকা হাতবদল হয় অফিসের বাইরে। নিচের ধাপগুলো মানলে কারও সম্পর্কে সন্দেহ করার পরিস্থিতিই তৈরি হয় না।
- প্রতিটি প্রতিনিধিকে নম্বরসহ রশিদ বই বুঝিয়ে দিন এবং কোন বই কাকে দেওয়া হলো তা রেজিস্টারে লিখুন।
- নির্দিষ্ট দিন ঠিক করুন যে দিন প্রতিনিধি টাকা ও রশিদ বই নিয়ে অফিসে জমা দেবেন।
- জমা দেওয়ার সময় বইয়ের কপি দেখে প্রতিটি রশিদের অংক যোগ করে জমা দেওয়া টাকার সাথে মিলান।
- প্রতিনিধিকে জমার জন্য আলাদা একটি প্রাপ্তি রশিদ দিন, যাতে তার দায়িত্ব শেষ হয়েছে তা প্রমাণ থাকে।
- অফিসে জমা হওয়ার দিনেই সেই টাকা হিসাবের খাতায় আয় হিসেবে এন্ট্রি করুন।
- মাস শেষে অব্যবহৃত রশিদ বই ফেরত নিয়ে সর্বশেষ ব্যবহার হওয়া নম্বর মিলিয়ে নিন।
স্বচ্ছতা বাড়াতে আর কী করতে পারেন?
- বড় অংকের দান সম্ভব হলে ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিন, এতে দুই পক্ষের কাছেই প্রমাণ থাকে।
- একজন আদায় করবেন আর অন্যজন হিসাব লিখবেন, এই ভাগটি অনেক ভুল ঠেকায়।
- নির্মাণ বা বিশেষ প্রকল্পের তহবিল আলাদা রাখুন এবং সেই খাতেই খরচ করুন।
- বছরে অন্তত একবার আয় ব্যয়ের সারসংক্ষেপ দাতা ও এলাকাবাসীর সামনে প্রকাশ করুন।
- রশিদ বই ছাপানোর সময় ক্রমিক নম্বর আগেই ছাপান, হাতে লেখা নম্বর এড়িয়ে চলুন।
কোন খাতের চাঁদা কোথায় লিখবেন?
মাদ্রাসায় সব দান এক রকম নয়। কেউ সাধারণ খরচের জন্য দেন, কেউ নির্দিষ্টভাবে এতিম শিক্ষার্থীর খোরাকির জন্য দেন, আবার কেউ ভবন নির্মাণের জন্য। এই টাকাগুলো এক ঘরে লিখলে পরে আর আলাদা করা যায় না। তাই রশিদ বইয়ে খাতের একটি ঘর রাখুন এবং আদায়ের সময়ই দাতার কাছ থেকে জেনে নিন তিনি কোন খাতে দিচ্ছেন। কিছু না বললে সাধারণ তহবিল লিখুন।
বিশেষ করে তিনটি খাত আলাদা রাখা সবচেয়ে জরুরি। এক, যাকাত ও সদকার তহবিল, কারণ এই টাকা ব্যয়ের শর্ত আলাদা। দুই, লিল্লাহ বোর্ডিং বা খোরাকি তহবিল, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের খাওয়ার খরচে যায়। তিন, নির্মাণ বা সংস্কার তহবিল, যেখানে টাকা জমা হতে থাকে এবং এক সাথে বড় খরচ হয়। এই তিনটি আলাদা রাখলে বছর শেষে প্রতিটি খাতে কত এলো আর কত খরচ হলো তা পৃথকভাবে দেখানো যায়।
বছরের বিশেষ সময়ে আদায় কীভাবে সামলাবেন?
রমজান, কোরবানি এবং বার্ষিক মাহফিলের সময় অল্প কয়েক দিনে বড় অঙ্কের দান আসে। এই সময়েই সবচেয়ে বেশি হিসাব এলোমেলো হয়। আগেই কয়েকটি প্রস্তুতি নিলে ঝামেলা অনেক কমে। যেমন পর্যাপ্ত রশিদ বই আগেই ছাপানো, কারা আদায় করবে তাদের নাম তালিকা করে রাখা, প্রতিদিন রাতেই জমা নেওয়া এবং বড় অঙ্কের দানের ক্ষেত্রে নগদের বদলে ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। মাহফিল শেষ হওযার পর এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো আদায়ের হিসাব চূড়ান্ত করে কমিটিকে জানিয়ে দিন, দেরি হলেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
সফটওয়্যারে রশিদ দিলে কী বদলায়?
সফটওয়্যারে আদায় করলে রশিদ নম্বর নিজে থেকেই পরপর তৈরি হয়, তাই নম্বর বাদ পড়া বা দুইবার হওয়ার সুযোগ থাকে না। দাতার নাম একবার তুললে পরেরবার শুধু মোবাইল নম্বর দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় এবং তার পুরনো সব দানের তালিকা এক পাতায় দেখা যায়। আদায়ের সাথে সাথেই টাকা আয় খাতে চলে যায়, ফলে আলাদা করে হিসাবের খাতায় লেখার কাজটি থাকে না। ছাপানো রশিদে মাদ্রাসার নাম, লোগো ও ঠিকানা থাকায় দেখতেও পেশাদার লাগে। বিস্তারিত ফি, চাঁদা ও দান আদায় পাতায় দেখুন, আর আদায়কৃত টাকা পরে কীভাবে আয় ব্যয় হিসাবে প্রতিফলিত হয় তাও দেখে নিতে পারেন।
শুধু রশিদ নয়, বকেয়া বেতন বা ওয়াদা করা দান কার কাছে কত বাকি আছে তাও তালিকা আকারে পাওয়া যায়। এই তালিকা ধরে এসএমএস দিলে অনেক সময় মনে করিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট হয় এবং আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে সহজ হয়।
রশিদ ও হিসাব এক জায়গায় আনতে চান?
ছবক মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে আদায়, রশিদ প্রিন্ট, দাতার রেকর্ড ও বকেয়ার তালিকা একসাথে পাবেন। ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপে জানালেই বিনামূল্যে ডেমো দেখানো হবে।