মাদ্রাসা সফটওয়্যার কেন দরকার? সুবিধা, ফিচার ও শুরু করার গাইড
মাদ্রাসা সফটওয়্যার কেন দরকার, এক কথায় উত্তর: খাতা, রেজিস্টার ও ফাইলে ছড়িয়ে থাকা ছাত্র, হাজিরা, ফি, চাঁদা, বেতন ও পরীক্ষার তথ্য এক জায়গায় এনে ভুল কমানো, সময় বাঁচানো এবং কমিটি ও অভিভাবকের সামনে স্বচ্ছ হিসাব রাখার জন্য। হাতে লেখা খাতায় একজন ছাত্রের বকেয়া বের করতে যেখানে পাতা উল্টাতে হয়, সফটওয়্যারে নাম লিখলেই সব দেখা যায়। এই লেখায় মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার আসলে কী, কোন কোন কাজ এতে হয়, ক্লাউড ভিত্তিক হওয়ার মানে কী, খরচ কত এবং কীভাবে শুরু করবেন, তার পুরোটা এক জায়গায় দেওয়া হলো।

মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার আসলে কী?
মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার হলো এমন একটি অনলাইন সিস্টেম, যেখানে মাদ্রাসার প্রশাসনিক, একাডেমিক ও আর্থিক সব কাজ একটি ড্যাশবোর্ড থেকে চালানো যায়। ছাত্র ভর্তি থেকে শুরু করে সার্টিফিকেট দেওয়া পর্যন্ত একজন ছাত্রের পুরো যাত্রা এতে রেকর্ড থাকে। শিক্ষকের নিয়োগ, হাজিরা ও বেতন, মাদ্রাসার আয় ও ব্যয়, পরীক্ষার নম্বর ও মার্কশিট, হিফজ বিভাগের দৈনিক পাঠের হিসাব, সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা মডিউল থাকে, কিন্তু তথ্য একটাই জায়গায় জমা হয়।
সাধারণ স্কুল সফটওয়্যারের সাথে এর মূল পার্থক্য হলো কাঠামো। মাদ্রাসায় জামাত বা মারহালা অনুযায়ী ক্লাস, কিতাব ভিত্তিক পাঠ্যসূচি, হিফজ ও নাজেরা বিভাগের আলাদা রেকর্ড, চাঁদা ও দান ভিত্তিক আয়, লিল্লাহ বোর্ডিং এবং আলিয়া ধারায় বোর্ডের রেজাল্ট ফরম্যাট, এসব বিষয় মাথায় রেখে বানানো না হলে সফটওয়্যারের অর্ধেক ঘর খালি পড়ে থাকে। ছবক মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কওমি, আলিয়া, হিফজ ও নূরানী, সব ধারার জন্য তৈরি এবং এর পুরো ইন্টারফেস বাংলায়।
মাদ্রাসা সফটওয়্যার কেন দরকার, খাতায় কী সমস্যা?
খাতা খারাপ নয়, কিন্তু খাতার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে যা মাদ্রাসা বড় হলে প্রতিদিন সামনে আসে। প্রথমত, একই তথ্য একাধিক জায়গায় লিখতে হয়: ভর্তি খাতায়, হাজিরা খাতায়, ফি খাতায় ও পরীক্ষার খাতায় একই ছাত্রের নাম চারবার লেখা হয়, আর একবার ভুল হলে সব জায়গায় মিলিয়ে ঠিক করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, রিপোর্ট বানাতে সময় লাগে: মাসের শেষে কত টাকা আদায় হলো, কার কত বকেয়া, কোন জামাতে কতজন অনুপস্থিত, এসব বের করতে হিসাবরক্ষককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যোগ করতে হয়।
তৃতীয়ত, খাতা হারালে বা পুড়লে তথ্যও হারায়, কোনো ব্যাকআপ থাকে না। চতুর্থত, হিসাবরক্ষক বদলালে নতুন মানুষকে পুরো খাতা বুঝে নিতে হয়, অনেক কিছু তার মাথাতেই থেকে যায়। পঞ্চমত, অভিভাবক জানতে চাইলে তার সন্তান আজ ক্লাসে এসেছে কি না বা কত টাকা বাকি, অফিসে ফোন করা ছাড়া উপায় থাকে না। সফটওয়্যার এই পাঁচটি সমস্যাই এক সাথে দূর করে, কারণ তথ্য একবার এন্ট্রি হয়, রিপোর্ট নিজে থেকে তৈরি হয়, ব্যাকআপ সার্ভারে থাকে এবং অভিভাবক অ্যাপে নিজেই দেখতে পারেন।
মাদ্রাসা সফটওয়্যারে কোন কোন কাজ হয়?
নিচের তালিকায় মাদ্রাসার মূল কাজগুলো খাতায় কীভাবে হয় আর সফটওয়্যারে কীভাবে হয়, তা পাশাপাশি দেখানো হলো। এটি ছবক সফটওয়্যারের বর্তমান ফিচার অনুযায়ী সাজানো।
| কাজ | খাতায় | সফটওয়্যারে |
|---|---|---|
| ছাত্র ভর্তি ও প্রোফাইল | ভর্তি ফরম ফাইলে, তথ্য খুঁজতে সময় লাগে | ছবিসহ প্রোফাইল, অভিভাবকের ফোন, জামাত, বিভাগ ও ভর্তি নম্বর এক ক্লিকে |
| হাজিরা | প্রতিদিন খাতায় টিক, মাসিক হিসাব হাতে | মোবাইল বা ZKTeco বায়োমেট্রিক ডিভাইসে হাজিরা, অনুপস্থিত হলে অভিভাবকের কাছে SMS |
| ফি, চাঁদা ও দান | রসিদ বইয়ের কার্বন কপি, বকেয়া খুঁজতে পাতা উল্টানো | রসিদ প্রিন্ট, বকেয়া তালিকা, দাতা ভিত্তিক চাঁদার রিপোর্ট |
| শিক্ষক ও বেতন | আলাদা বেতন খাতা | শিক্ষকের প্রোফাইল, হাজিরা ও মাসিক বেতন শিট |
| পরীক্ষা ও ফলাফল | নম্বর খাতায়, মার্কশিট হাতে লেখা | নম্বর এন্ট্রি করলেই মার্কশিট, মেধা তালিকা ও ফলাফল শিট |
| হিফজ বিভাগ | হাফেজ সাহেবের নিজস্ব খাতা | দৈনিক পাঠের মান ও মাসের গণনা |
| হিসাব | আয় ব্যয়ের আলাদা খাতা, বছর শেষে মিলানো | খাত ভিত্তিক আয় ব্যয়, যেকোনো দিনের ব্যালান্স |
| অভিভাবক যোগাযোগ | ফোন বা নোটিশ | অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপে হাজিরা, ফলাফল ও বকেয়া, SMS নোটিশ |
প্রতিটি মডিউলের বিস্তারিত আলাদা পাতায় দেওয়া আছে। সব ফিচারের তালিকা এক নজরে দেখতে ফিচার পাতা দেখুন, হাজিরার জন্য হাজিরা ও বায়োমেট্রিক এবং হিফজ বিভাগের জন্য হিফজ ট্র্যাকিং পাতায় আলাদা করে বলা আছে।
হাজিরা ও হিফজ ট্র্যাকিং সফটওয়্যারে কীভাবে সহজ হয়?
হাজিরা মাদ্রাসার সবচেয়ে নিয়মিত কাজ, তাই এটাই সবার আগে সফটওয়্যারে আনা উচিত। ছবক সফটওয়্যারে দুইভাবে হাজিরা নেওয়া যায়। প্রথমত, শিক্ষক নিজের মোবাইল থেকে জামাতের তালিকা খুলে উপস্থিত ও অনুপস্থিত চিহ্নিত করেন, এতে এক মিনিটের বেশি লাগে না। দ্বিতীয়ত, ZKTeco ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেস ডিভাইস বসালে ছাত্র আঙুল বা মুখ দেখালেই হাজিরা সার্ভারে চলে যায়। দুই ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ছাত্রের অভিভাবকের কাছে স্বয়ংক্রিয় SMS যেতে পারে, ফলে ছাত্র মাদ্রাসার নাম করে বাইরে গেলে অভিভাবক সাথে সাথে জানতে পারেন।
হিফজ বিভাগে প্রতিদিন প্রতিটি ছাত্রের দৈনিক পাঠের মান কত হলো তা হাফেজ সাহেব মোবাইলে এন্ট্রি করেন। সফটওয়্যার নিজে থেকে হিসাব রাখে কে কত পারা শেষ করল, কার অগ্রগতি থেমে আছে এবং কত দিনে হিফজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা। অভিভাবক অ্যাপে ঢুকে সন্তানের আজকের হাজিরা ও বকেয়া দেখতে পান, এটা অনেক অভিভাবকের কাছে খুব কাজের সুবিধা।
ক্লাউড ভিত্তিক মাদ্রাসা সফটওয়্যার (Cloud Based Madrasa Software) মানে কী, আর কেন এটাই ভালো?
ক্লাউড ভিত্তিক মানে সফটওয়্যার ও তথ্য মাদ্রাসার কম্পিউটারে নয়, ইন্টারনেটের একটি নিরাপদ সার্ভারে থাকে। প্রতিটি মাদ্রাসা নিজের একটি ঠিকানা (সাবডোমেইন) পায়, আর সেখানে ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে মুহতামিম, হিসাবরক্ষক, শিক্ষক, যে কেউ যেকোনো জায়গা থেকে মোবাইল বা কম্পিউটারে ঢুকতে পারেন। এর কয়েকটি সরাসরি সুবিধা আছে।
- মাদ্রাসার কম্পিউটার নষ্ট হলে বা চুরি হলে তথ্য হারায় না, কারণ তা সার্ভারে জমা থাকে।
- আলাদা সফটওয়্যার কিনে ইনস্টল করতে হয় না, ব্রাউজার বা অ্যাপ খুললেই হলো।
- আপডেট নিজে থেকে আসে, নতুন ফিচারের জন্য আলাদা টাকা লাগে না।
- মুহতামিম সফরে থাকলেও আজকের আদায় ও হাজিরা দেখতে পারেন।
- একাধিক শাখা বা শিফট থাকলে সব এক জায়গা থেকে চালানো যায়।
একটাই শর্ত: এন্ট্রি ও রিপোর্ট দেখার সময় ইন্টারনেট লাগে। একটি সাধারণ মোবাইল ডাটা সংযোগেই কাজ চলে, ভারী ইন্টারনেট দরকার হয় না।
মাদ্রাসা ডিজিটাল করা মানে কি শুধু সফটওয়্যার কেনা?
না। সফটওয়্যার একটি মাধ্যম, আসল কাজ হলো মাদ্রাসার কাজের ধরন একটু গুছিয়ে নেওয়া। ডিজিটাল মাদ্রাসা বলতে বোঝায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে তথ্য একবার এন্ট্রি হয় এবং সবাই সেই এক তথ্য থেকেই কাজ করে, যেখানে অভিভাবক নিজেই অ্যাপে সন্তানের খবর দেখেন, যেখানে কমিটির মিটিংয়ে হিসাব মুখে নয়, রিপোর্ট ছাপিয়ে দেখানো হয় এবং যেখানে পরিচালক বদলালেও তথ্য প্রতিষ্ঠানের কাছেই থাকে। এর সাথে মাদ্রাসার একটি ওয়েবসাইট, অনলাইন ভর্তি ফরম ও SMS নোটিশ যোগ হলে ছবিটা পূর্ণ হয়। এই পুরো রূপান্তর ধাপে ধাপে কীভাবে করবেন তা মাদ্রাসা ডিজিটাল করার গাইড লেখায় আলাদা করে বলা আছে।
মাদ্রাসা সফটওয়্যারের খরচ কত?
ছবক সফটওয়্যারের মূল্য তিনভাবে নেওয়া যায়: মাসিক ৫০০ টাকা, বার্ষিক ৫,০০০ টাকা, অথবা এককালীন ২০,০০০ টাকা। এর সাথে শুরুতে একবার ইনস্টলেশন ও প্রশিক্ষণ ফি আছে: ২০০ জনের কম ছাত্র হলে ২,০০০ টাকা, ২০০ জনের বেশি হলে ৫,০০০ টাকা। এই মূল্যের মধ্যে সাবডোমেইন ও হোস্টিং, অভিভাবক ও শিক্ষক অ্যাপ, সব আপডেট এবং সাপোর্ট ধরা আছে। ছাত্রসংখ্যা অনুযায়ী আলাদা টাকা লাগে না। RFID আইডি কার্ড, বায়োমেট্রিক ডিভাইস, SMS প্যাকেজ ও মাদ্রাসার ওয়েবসাইট ঐচ্ছিক, দরকার হলে আলাদা করে নেওয়া যায়। বিস্তারিত মূল্য তালিকা পাতায় দেওয়া আছে।
কীভাবে শুরু করবেন?
- ফ্রি ডেমো পাতায় গিয়ে অথবা ফোনে যোগাযোগ করে সফটওয়্যারটি নিজের চোখে দেখে নিন।
- চলতি শিক্ষাবর্ষের ছাত্র তালিকা, জামাত ও শিক্ষকদের তালিকা একটি এক্সেল বা কাগজে গুছিয়ে দিন। পুরনো খাতা তুলতে হবে না।
- ইনস্টলেশনের পর আপনার মাদ্রাসার নিজস্ব ঠিকানা ও ইউজার তৈরি হবে, তখন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
- প্রথম মাসে শুধু হাজিরা ও ফি আদায় দিয়ে শুরু করুন, অভ্যাস হলে পরীক্ষা, হিফজ ও বেতন বিভাগ যোগ করুন।
- অভিভাবকদের ছবক অ্যাপ নামাতে বলুন, তখন থেকে তারা নিজেরাই তথ্য দেখতে পারবেন।
প্রতিটি কাজ কীভাবে করতে হয় তার ভিডিও টিউটোরিয়াল পাতায় বাংলায় দেওয়া আছে। কওমি মাদ্রাসার জন্য বিশেষভাবে সাজানো গাইড পড়তে পারেন কওমি মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার লেখায়, আর আলিয়া মাদ্রাসার জন্য আলিয়া মাদ্রাসা সফটওয়্যার পাতায়।
৬৩৯টির বেশি মাদ্রাসা ইতিমধ্যে ছবক ব্যবহার করছে
আপনার মাদ্রাসার জন্য সফটওয়্যারটি কেমন কাজ করবে তা ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে ফ্রি ডেমোতে দেখে নিন।