কমিটির বার্ষিক সভা: এক বছরের ছাত্র, ফলাফল ও আয়-ব্যয় এক রিপোর্টে
বার্ষিক রিপোর্ট আসলে তিনটি অংশ: ছাত্র, ফলাফল আর টাকা। প্রতিটি অংশে কয়েকটি নির্দিষ্ট সংখ্যা থাকলেই কমিটির বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর আগেই দেওয়া হয়ে যায়। সভার দিন যে বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হয়, তার কারণ প্রায় সবসময় সংখ্যা খারাপ নয়, সংখ্যা হাতের কাছে না থাকা।
এক নজরে
বার্ষিক রিপোর্টের কাঠামো।
- কাগজ আগে গোছান, ছয় রকম
- ছাত্র অংশ, শুরু ও শেষের সংখ্যা
- ফলাফল অংশ, উত্তীর্ণের হার
- আয়-ব্যয় অংশ, খাত ধরে
- রেজুলেশন, প্রচলিত ফরম্যাটে
- আট প্রশ্নের উত্তর আগে তৈরি
বার্ষিক সভার আগে কোন কাগজগুলো গোছাতে হবে?
সভার এক সপ্তাহ আগে ছয় ধরনের কাগজ এক জায়গায় আনুন। এই ছয়টি হাতে থাকলে রিপোর্ট লেখা আর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, দুটোই সহজ হয়ে যায়।
- রশিদ বই: বছরের সবগুলো, ক্রমিক নম্বর ধারাবাহিক আছে কি না দেখে নিন
- ভাউচার: খরচের কাগজ, তারিখ অনুযায়ী সাজানো
- ব্যাংক বিবরণী: বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত
- হাজিরা খাতা: ছাত্র ও শিক্ষক দুটোই
- ফলাফল শিট: অভ্যন্তরীণ ও বোর্ড পরীক্ষার
- আগের সভার সিদ্ধান্ত: গতবার কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল আর তার কতটা হয়েছে
শেষ কাগজটি সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে অথচ সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে। কমিটি প্রথমেই জানতে চায় গতবারের সিদ্ধান্তগুলোর কী হলো।
ছাত্র সংক্রান্ত অংশে যা থাকবে
এই অংশে অনুচ্ছেদ নয়, সংখ্যা দিন। ছয়টি সংখ্যাতেই পুরো বছরের ছবিটা দাঁড়িয়ে যায়।
- বছরের শুরুতে ছাত্রসংখ্যা
- বছরের শেষে ছাত্রসংখ্যা
- নতুন ভর্তি কতজন
- মাঝপথে চলে গেছে কতজন, আর সম্ভব হলে কেন
- জামাত ধরে ভাগ, আবাসিক ও অনাবাসিক আলাদা করে
- বছরের হাজিরার গড়, অন্তত শতাংশে
ঝরে পড়ার সংখ্যাটি লুকাবেন না। কমিটি এটি জানেই, আর রিপোর্টে না থাকলে মনে হয় গোপন করা হচ্ছে। বরং পাশে এক লাইনে কারণ লিখে দিলে আলোচনা গঠনমূলক হয়।
ফলাফল সংক্রান্ত অংশে যা থাকবে
ফলাফলের অংশে দুটি জিনিস আলাদা রাখুন: প্রতিষ্ঠানের নিজের পরীক্ষা, আর বোর্ডের পরীক্ষা। দুটো এক করে ফেললে ছবিটা ঝাপসা হয়।
প্রতিটির জন্য উত্তীর্ণের হার, সর্বোচ্চ ও গড় নম্বর, আর জামাত ধরে ভাগ দিন। হিফজ বিভাগ থাকলে বছরে কতজন সম্পন্ন করেছে সেই সংখ্যাটি আলাদা করে লিখুন, কারণ কমিটি ও দাতা দুই পক্ষই এটি জানতে চান।
শেষে একটি ছোট অংশ রাখুন দুর্বল দিক নিয়ে: কোন বিষয়ে ফল সবচেয়ে খারাপ হয়েছে আর আগামী বছর কী করার পরিকল্পনা। এই এক অনুচ্ছেদটিই রিপোর্টকে হিসাবের কাগজ থেকে পরিকল্পনার কাগজে বদলে দেয়।
আয়-ব্যয় অংশ: রশিদ বই থেকে বার্ষিক হিসাব দাঁড় করানো
টাকার অংশটি খাত ধরে দিন, মাস ধরে নয়। কমিটি জানতে চায় কোন খাতে কত এল আর কোন খাতে কত গেল।
আয়ের দিকে সাধারণত থাকে ভর্তি ও বেতন, চাঁদা ও দান, বোর্ডিং ফি, আর অন্যান্য। ব্যয়ের দিকে শিক্ষক ও কর্মচারীর বেতন, বোর্ডিংয়ের বাজার, বিদ্যুৎ ও পানি, মেরামত, আর অফিস খরচ। এর সাথে বছরের প্রারম্ভিক জের ও সমাপনী জের অবশ্যই থাকবে, নইলে সংখ্যাগুলো ভাসমান মনে হয়।
বকেয়ার তালিকা মূল হিসাবের ভেতরে ঢোকাবেন না, আলাদা কাগজে দিন। একইভাবে একাধিক তহবিল থাকলে প্রতিটি আলাদা কলামে দেখান। জের মেলানোর সাত ধাপ লেখাটিতে খাত ভাগ থেকে বছর বন্ধ করা পর্যন্ত পুরো পদ্ধতি আছে, আর কমিটিকে মাসিক রিপোর্ট দেওয়ার নিয়ম আলাদা লেখায় আছে।
আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে সরকারি নির্দেশনা প্রসঙ্গে
নিয়ম যাই হোক, ব্যবহারিক দিক থেকে চারটি জিনিস সব ধরনের প্রতিষ্ঠানেই কাজে লাগে: প্রতিটি টাকার বিপরীতে রশিদ বা ভাউচার, প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব, বড় খরচের আগে কমিটির অনুমোদন, আর বছরে অন্তত একবার হিসাব উপস্থাপন। এই চারটি মানলে যে নির্দেশনাই আসুক, প্রস্তুতি থাকে।
নিরীক্ষার আগে যে কাগজগুলো খোঁজা হয়
নিরীক্ষা মানে ভুল ধরা নয়, প্রমাণ দেখা। যিনি দেখতে আসেন তিনি সংখ্যা নয়, সংখ্যার পেছনের কাগজ খোঁজেন। চারটি জায়গায় সবার আগে নজর যায়।
- রশিদের ক্রমিক নম্বর: ধারাবাহিক কি না, কোনো নম্বর বাদ পড়েছে কি না, বাতিল রশিদ বইতে আছে কি না
- ভাউচারের ক্রম: প্রতিটি খরচের বিপরীতে কাগজ আছে কি না, আর তাতে স্বাক্ষর আছে কি না
- ব্যাংক জমার প্রমাণ: বড় অঙ্কের আদায় ব্যাংকে জমা হয়েছে কি না, নাকি হাতেই রয়ে গেছে
- অনুমোদনের রেজুলেশন: বড় খরচ, নিয়োগ বা কেনাকাটার আগে কমিটির সিদ্ধান্ত লেখা আছে কি না
এই চারটি ঠিক থাকলে সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও উত্তর দেওয়া যায়। আর সফটওয়্যার থাকা মানেই নিরীক্ষায় কোনো প্রশ্ন উঠবে না, এমন নয়; কাগজ ও অনুমোদনের কাজটি মানুষকেই করতে হয়।
সভার রেজুলেশন লেখার প্রচলিত ফরম্যাট ও নমুনা
রেজুলেশন বা কার্যবিবরণী লেখার কোনো একটিমাত্র নির্ধারিত ছাঁচ নেই, তবে প্রচলিত ফরম্যাটে ছয়টি জিনিস থাকে: সভার তারিখ ও স্থান, সভাপতির নাম, উপস্থিত সদস্যদের নাম ও স্বাক্ষর, আলোচ্যসূচি, প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত, আর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার।
নিচের নমুনাগুলোতে প্রতিষ্ঠানের নাম কাল্পনিক, শুধু গড়ন বোঝানোর জন্য।
আলোচ্যসূচি ১: গত শিক্ষাবর্ষের আয় ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন।
সিদ্ধান্ত: সম্পাদক কর্তৃক উপস্থাপিত গত শিক্ষাবর্ষের আয় ব্যয়ের হিসাব সভায় পাঠ করে শোনানো হয় এবং উপস্থিত সদস্যগণ সর্বসম্মতিক্রমে তা অনুমোদন করেন। বকেয়ার তালিকা পৃথকভাবে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়। বাস্তবায়নে: হিসাব রক্ষক।
আলোচ্যসূচি ২: আগামী শিক্ষাবর্ষের বাজেট।
সিদ্ধান্ত: আগামী শিক্ষাবর্ষের সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের বিবরণ পর্যালোচনা করে বাজেট অনুমোদিত হয়। বাজেটের অতিরিক্ত কোনো খরচের প্রয়োজন হলে পূর্বানুমোদন নিতে হবে। বাস্তবায়নে: মুহতামিম ও হিসাব রক্ষক।
আলোচ্যসূচি ৩: শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ।
সিদ্ধান্ত: শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও বাছাই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাছাই কমিটির সুপারিশ পরবর্তী সভায় উপস্থাপিত হবে। বাস্তবায়নে: সম্পাদক।
আলোচ্যসূচি ৪: ব্যাংক হিসাব পরিচালনা।
সিদ্ধান্ত: প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবটি যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে এবং স্বাক্ষরদাতা হিসেবে সভাপতি ও সম্পাদককে মনোনীত করা হয়। ব্যাংককে অবহিত করার দায়িত্ব সম্পাদকের। বাস্তবায়নে: সম্পাদক।
প্রতিটি সিদ্ধান্তের শেষে বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার তা লিখে রাখুন। এই এক লাইনটি না থাকলে পরের সভায় দেখা যায় কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়নি, অথচ কারও দোষও দেওয়া যাচ্ছে না।
কমিটি যে প্রশ্নগুলো করে, আগেই যে উত্তর তৈরি রাখবেন
প্রায় প্রতিটি সভাতেই এই আটটি প্রশ্নের কোনো না কোনোটি আসে। প্রতিটির পাশে লেখা আছে কোন কাগজটি হাতে রাখলে উত্তর দিতে দেরি হয় না।
| যে প্রশ্নটি আসে | যে কাগজ হাতে রাখবেন |
|---|---|
| ছাত্রসংখ্যা কমল কেন? | শুরু ও শেষের সংখ্যা, ঝরে পড়ার তালিকা ও কারণ |
| বকেয়া এত বেশি কেন? | ছাত্র ধরে বকেয়ার তালিকা ও আদায়ের চেষ্টা |
| এই খরচটা কার অনুমোদনে হলো? | ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট সভার রেজুলেশন |
| ব্যাংকে কত আছে? | সর্বশেষ ব্যাংক বিবরণী ও নগদ বইয়ের জের |
| লিল্লাহ ফান্ডের টাকা কোথায় গেল? | ফান্ডভিত্তিক আলাদা খতিয়ান পাতা |
| ফল খারাপ হলো কেন? | বিষয়ভিত্তিক ফলাফল ও উত্তীর্ণের হার |
| শিক্ষক নিয়মিত আসেন তো? | শিক্ষকের হাজিরার মাসিক হিসাব |
| গতবারের সিদ্ধান্তগুলোর কী হলো? | আগের সভার রেজুলেশন ও বাস্তবায়নের অবস্থা |
সংখ্যা বড় হলে কী বদলায়?
ছাত্রসংখ্যা কম হলে বার্ষিক রিপোর্ট হাতে বানানো যায়, সময় লাগে কয়েক দিন। কয়েকশ ছাত্র আর একাধিক তহবিল হলে শুধু সংখ্যা জোগাড় করতেই সপ্তাহ পার হয়ে যায়, আর তখনই ভুল ঢোকে।
তথ্য যদি সারা বছর একই জায়গায় ওঠে, তাহলে বছর শেষে পুরো বছরের হিসাব একসাথে পাওয়া যায় এবং পরীক্ষার ফলাফলের রিপোর্টও তৈরি অবস্থায় থাকে। তখন সভার আগের কাজটা হয় সংখ্যা খোঁজা নয়, সংখ্যা পড়ে দেখা। বছরের পুরো হিসাব একসাথে কীভাবে পাওয়া যায় আর পরীক্ষা ও ফলাফলের রিপোর্ট কেমন হয়, তা আলাদা পাতায় দেখানো আছে।
বার্ষিক সভার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
আপনার তহবিল ও জামাতের তালিকা বলুন, রিপোর্টটা কেমন দাঁড়ায় ডেমোতে দেখিয়ে দেব।