রমজানে মাদ্রাসার চাঁদা, যাকাত ও দান: হিসাব ও রশিদ রাখার নিয়ম
রমজানে মাদ্রাসার চাঁদা, যাকাত ও সাধারণ দান একসাথে বেড়ে যায়, তাই এই মাসে হিসাব রাখার মূল নিয়ম তিনটি: যাকাতের টাকা আলাদা তহবিলে রাখা, প্রতিটি টাকার বিপরীতে রশিদ দেওয়া, আর দিনের জমা দিনেই খাতায় তোলা। এই তিনটি নিয়ম মানলে ঈদের পর কমিটির সামনে হিসাব দিতে গিয়ে কাগজ খুঁজতে হয় না, আর দাতার আস্থাও বাড়ে। নিচে রমজান ও ঈদ মৌসুমে চাঁদা আদায়, দাতা রেজিস্টার, প্রতিনিধি দিয়ে আদায় ও দৈনিক জমা-খরচের পুরো পদ্ধতি, এবং ছবক সফটওয়্যারে তা কীভাবে হয়, গুছিয়ে দেওয়া হলো।
রমজানে মাদ্রাসার চাঁদা ও দান কেন আলাদা নজর চায়?
সারা বছরে যে পরিমাণ দান আসে, তার বড় অংশ অনেক মাদ্রাসায় রমজান ও ঈদের আগে আসে। মানুষ যাকাত দেন, ফিতরা দেন, ইফতারের জন্য দেন, এতিম ছাত্রদের খাবারের জন্য দেন, আবার সাধারণ চাঁদাও দেন। একই দিনে একই মানুষের কাছ থেকে দুই রকম টাকা আসতে পারে: একটি যাকাত, আরেকটি সাধারণ দান। এই দুটো যদি এক খাতায় মিশে যায়, পরে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তার ওপর রমজানে দাতা আসেন অনিয়মিত সময়ে, অনেকে প্রতিনিধির হাতে টাকা পাঠান, অনেকে বিকাশ বা ব্যাংকে পাঠিয়ে ফোনে জানান। এত দিক থেকে আসা টাকার হিসাব হাতে রাখা কঠিন বলেই রমজানের আগে একটি পরিষ্কার পদ্ধতি ঠিক করে নেওয়া দরকার।
যাকাত কেন আলাদা তহবিলে রাখবেন?
যাকাতের টাকা নির্দিষ্ট খাতে খরচ করতে হয়, সাধারণ দানের মতো মাদ্রাসার যেকোনো প্রয়োজনে নয়। তাই হিসাবের দিক থেকে যাকাত একটি সম্পূর্ণ আলাদা তহবিল: আলাদা জমা, আলাদা খরচ, আলাদা ব্যালান্স। ব্যাংকে আলাদা হিসাব রাখতে পারলে সবচেয়ে ভালো; না পারলে অন্তত খাতায় ও সফটওয়্যারে আলাদা তহবিল হিসেবে রাখুন।
ছবকে আয়ের খাত তৈরি করার সময় “যাকাত তহবিল” নামে আলাদা খাত এবং চাইলে আলাদা ক্যাশ বা ব্যাংক হিসাব রাখা যায়। যাকাতের জমা সেই খাতে ঢুকবে, যাকাতের খরচও সেই খাত থেকেই যাবে, আর রিপোর্টে যাকাত তহবিলের জমা, খরচ ও বাকি আলাদা করে দেখা যাবে। কোন খরচ যাকাত থেকে করা জায়েজ, সেটি মুফতি সাহেবের পরামর্শে কমিটি ঠিক করবে; সফটওয়্যার সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হিসাব রাখবে।
কোন টাকা কোন খাতে লিখবেন?
রমজানে আসা টাকা অন্তত নিচের খাতগুলোতে ভাগ করে রাখুন। খাতের নাম মাদ্রাসার নিজের মতো হতে পারে; মূল কথা হলো যাকাত, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দান আর সাধারণ দান আলাদা থাকা।
| টাকার ধরন | কোথায় লিখবেন | কেন আলাদা |
|---|---|---|
| যাকাত | যাকাত তহবিল (আলাদা খাত ও সম্ভব হলে আলাদা হিসাব) | নির্দিষ্ট খাতে খরচের বাধ্যবাধকতা; মাসআলা আলেম ঠিক করবেন |
| ফিতরা | ফিতরা তহবিল বা যাকাত তহবিলের অধীনে আলাদা উপখাত | ঈদের আগে নির্দিষ্ট সময়ে বিতরণের বিষয় |
| ইফতার বা খাবারের দান | লিল্লাহ বোর্ডিং বা খাবার তহবিল | দাতা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে দিয়েছেন |
| এতিম ছাত্রের স্পনসর | এতিম তহবিল, ছাত্রের নাম ধরে | দাতা জানতে চান তাঁর টাকায় কোন ছাত্র পড়ছে |
| মাসিক বা বার্ষিক সাধারণ চাঁদা | সাধারণ চাঁদা খাত, দাতার নাম ধরে | নিয়মিত দাতার বকেয়া ও ধারাবাহিকতা দেখা যায় |
| এককালীন সাধারণ দান | সাধারণ দান খাত | মাদ্রাসার যেকোনো প্রয়োজনে খরচযোগ্য |
| নির্মাণ বা উন্নয়নের দান | উন্নয়ন তহবিল | দাতার উদ্দেশ্য অনুযায়ী খরচ এবং কমিটিকে আলাদা রিপোর্ট |
দাতা রেজিস্টার কীভাবে রাখবেন?
প্রতিটি দাতার জন্য একটি স্থায়ী এন্ট্রি রাখুন: নাম, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা বা এলাকা, কোন ধরনের দাতা (মাসিক চাঁদা, বার্ষিক, যাকাত, এককালীন), কে তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখেন। তারপর প্রতিটি জমা সেই দাতার নামে লিখুন। এতে বছর শেষে দেখা যায় কে কত দিয়েছেন, কোন নিয়মিত দাতার চাঁদা বাকি, আর পরের রমজানে কাকে আগে থেকে মনে করিয়ে দিতে হবে।
ছবকে দাতা প্রোফাইল তৈরি করলে তাঁর সব জমা এক জায়গায় দেখা যায়, মাসিক চাঁদার দাতার বকেয়া নিজে থেকে হিসাব হয় এবং দাতার মোবাইলে ধন্যবাদ বা রশিদের SMS যায়। রমজানের আগে নিয়মিত দাতাদের একসাথে SMS পাঠিয়ে মনে করিয়ে দেওয়াও যায়। হাতে খাতা রাখলে অন্তত একটি দাতা তালিকা আলাদা খাতায় রাখুন; মাদ্রাসার হিসাব খাতা লেখায় খাতার ছক দেওয়া আছে।
রশিদ কেমন হবে এবং কেন প্রতিটি টাকায় রশিদ দিতে হবে?
রশিদ দাতার অধিকার এবং মাদ্রাসার সুরক্ষা, দুটোই। রশিদে থাকা দরকার: মাদ্রাসার নাম ও ঠিকানা, রশিদ নম্বর, তারিখ, দাতার নাম, টাকার অঙ্ক (সংখ্যায় ও কথায়), কোন খাতে (যাকাত, সাধারণ দান, ইফতার), আদায়কারীর নাম ও স্বাক্ষর। যাকাতের রশিদে “যাকাত তহবিল” কথাটি স্পষ্ট লেখা থাকলে দাতা নিশ্চিন্ত হন যে তাঁর টাকা সঠিক খাতে গেছে।
ছবকে জমা এন্ট্রি করার সাথে সাথে ক্রমিক নম্বরসহ রশিদ প্রিন্ট হয়, আর দাতার মোবাইলে SMS-এ রশিদের সারাংশ যায়। রশিদ নম্বর সফটওয়্যার থেকে আসে বলে দুই বইয়ে একই নম্বর পড়ার সমস্যা হয় না, আর পরে কোনো রশিদ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নম্বর ধরে খুঁজে পাওয়া যায়। রশিদের নকশা ও ছাপার নিয়ম নিয়ে আলাদা লেখা আছে: চাঁদা আদায়ের রশিদ।
প্রতিনিধি দিয়ে আদায় করলে হিসাব কীভাবে মিলবে?
রমজানে অনেক মাদ্রাসা শিক্ষক, ছাত্র বা নির্দিষ্ট প্রতিনিধিকে এলাকায় বা বাজারে পাঠান চাঁদা তুলতে। এখানে গোলমাল হয় যখন প্রতিনিধি রশিদ বই নিয়ে যান কিন্তু ফেরত এসে কোন রশিদে কত তুলেছেন তার মিলান হয় না। নিয়ম করুন: প্রতিটি প্রতিনিধির নামে রশিদ বইয়ের নম্বরসীমা লিখে রাখা হবে, দিনের শেষে বা ফেরার দিন প্রতিটি রশিদের টাকা ক্যাশে জমা নিয়ে খাতায় তোলা হবে, এবং অব্যবহৃত রশিদ গুনে ফেরত নেওয়া হবে।
ছবকে প্রতিটি আদায়কারীর আলাদা ইউজার রাখা যায়; প্রতিনিধি নিজের মোবাইল অ্যাপ থেকেই দাতার নামে জমা এন্ট্রি করতে পারেন, দাতার মোবাইলে সাথে সাথে SMS যায়, আর অফিসে বসে দেখা যায় কোন প্রতিনিধি আজ কত তুললেন। ফেরার পর সেই টাকা মূল ক্যাশে জমা নিলে প্রতিনিধির হিসাব শূন্য হয়ে যায়। এতে রশিদ বই হারানো বা ভুলে যাওয়ার সমস্যা কমে।
দৈনিক জমা-খরচ ও কমিটিকে রিপোর্ট কীভাবে দেবেন?
- দিনের শুরুতে: আগের দিনের ক্যাশ ব্যালান্স মিলিয়ে নিন, প্রতিনিধিদের রশিদ বই বুঝিয়ে দিন।
- দিনের মধ্যে: প্রতিটি জমা দাতার নাম ও খাত ধরে এন্ট্রি, প্রতিটি খরচ (ইফতার, বাজার, বিল) খাত ধরে এন্ট্রি, রশিদ বা ভাউচার রাখা।
- দিনের শেষে: প্রতিনিধিদের টাকা বুঝে নেওয়া, হাতের ক্যাশ ও খাতার ব্যালান্স মিলানো, ব্যাংকে জমা দিলে তা-ও এন্ট্রি।
- সপ্তাহে একবার: যাকাত তহবিল, সাধারণ তহবিল ও খাবার তহবিলের আলাদা ব্যালান্স মুহতামিম সাহেবকে দেখানো।
- রমজান শেষে বা ঈদের পর: পুরো মাসের খাতভিত্তিক জমা-খরচ ও দাতা তালিকার রিপোর্ট কমিটির সামনে উপস্থাপন।
ছবকে প্রতিটি এন্ট্রি করা থাকলে এই রিপোর্টগুলো আলাদা করে বানাতে হয় না। দৈনিক ক্যাশ রিপোর্ট, খাতভিত্তিক আয়-ব্যয়, তহবিলভিত্তিক ব্যালান্স আর দাতাভিত্তিক জমার তালিকা যেকোনো দিন প্রিন্ট করা যায়। কমিটির সভায় কী কী রিপোর্ট নেওয়া ভালো, তার ছক কমিটি রিপোর্ট লেখায় দেওয়া আছে।
এবারের রমজানের হিসাব ছবক দিয়ে রাখতে চান?
দাতা রেজিস্টার, যাকাত ও সাধারণ তহবিল আলাদা, রশিদ প্রিন্ট ও SMS, প্রতিনিধির মোবাইল থেকে আদায়, দৈনিক ক্যাশ রিপোর্ট। রমজানের আগে সেট করে নিন, ফ্রি ডেমোতে দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নিন।