বছর শেষে হিসাব মিলছে না? জমা, খরচ ও জের মেলানোর সাত ধাপ

হিসাব না মেলার কারণ প্রায় সবসময়ই একটাই: কোনো একটা টাকা খাতায় ওঠেনি, অথবা এক টাকা দুই জায়গায় দুবার উঠেছে। খাত ঠিক করা, খতিয়ান টানা, প্রতিটি খাতের জের বের করা, নগদ ও ব্যাংক আলাদা করে মেলানো, বকেয়া ও অগ্রিম সরিয়ে রাখা, ডেবিট ক্রেডিট মিলিয়ে দেখা আর বছর বন্ধ করা, এই সাত ধাপে গেলে গরমিলটা কোথায় তা বেরিয়ে আসে।

এক নজরে

সাত ধাপ, ক্রম বদলাবেন না।

  • ধাপ ১ খাত ঠিক করা
  • ধাপ ২ খতিয়ান টানা
  • ধাপ ৩ প্রতিটি খাতের জের
  • ধাপ ৪ নগদ ও ব্যাংক মেলানো
  • ধাপ ৫ বকেয়া ও অগ্রিম আলাদা
  • ধাপ ৬ ডেবিট ক্রেডিট মেলানো
  • ধাপ ৭ বছর বন্ধ ও প্রারম্ভিক জের

হিসাব না মেলার সাধারণ কারণগুলো কী কী?

বছর শেষে সংখ্যা না মিললে বেশিরভাগ মাদ্রাসায় সন্দেহ যায় মানুষের দিকে, অথচ প্রায় সব ক্ষেত্রেই কারণটা পদ্ধতির। কোনো একটা টাকা লেখা হয়নি, বা এক টাকা দুই খাতায় দুবার উঠেছে। ছয়টি কারণেই বেশিরভাগ গরমিল হয়।

  • রশিদ ছাড়া টাকা নেওয়া: কেউ অফিসে এসে হাতে টাকা দিয়ে গেলেন, রশিদ পরে কাটব বলে আর কাটা হলো না
  • মৌখিক ছাড়: মুহতামিম কাউকে অর্ধেক মাফ করলেন, কিন্তু খাতায় পুরো টাকাই বকেয়া হিসেবে রয়ে গেল
  • দুই জায়গায় দুই খাতা: অফিসে এক খাতা, বোর্ডিংয়ে আরেক খাতা, মাঝখানে কিছু টাকা দুইবার বা একবারও ওঠেনি
  • শিক্ষকের অগ্রিম: বেতনের আগে টাকা দেওয়া হলো, সেটি খরচ না অগ্রিম, তা ঠিক করা হয়নি
  • ব্যাংকে জমার তারিখের ফারাক: ২৯ তারিখে জমা দেওয়া টাকা ব্যাংকে উঠল ২ তারিখে, তাই মাসের সংখ্যা মেলে না
  • ভাউচারবিহীন খরচ: বাজার বা মেরামতের টাকা দেওয়া হলো, কাগজ নেই, তাই কত গেল তা কেবল মনে আছে

ধাপ ১, খাত ঠিক করা ও প্রতিটি এন্ট্রিকে খাতে বসানো

খাত মানে হলো টাকার নাম ধরে ভাগ। আয়ের খাত আর ব্যয়ের খাত আলাদা করে একবার তালিকা বানিয়ে ফেলুন, তারপর প্রতিটি জমা ও খরচকে ওই তালিকার কোনো একটি খাতে বসান।

আয়ের দিকে সাধারণত থাকে ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি, বোর্ডিং ফি, চাঁদা ও দান, আর মাহফিলের সংগ্রহ। ব্যয়ের দিকে থাকে শিক্ষকের বেতন, কর্মচারীর বেতন, বোর্ডিংয়ের বাজার, বিদ্যুৎ ও পানি, মেরামত, ছাপা ও কাগজ, এবং যাতায়াত।

একটি নিয়ম কড়াভাবে মানুন: বছরের মাঝপথে নতুন খাত বাড়াবেন না। নতুন খাত দরকার হলে কমিটির সিদ্ধান্তে বছরের শুরুতে যোগ করুন। যখন তখন খাত বাড়লে আগের বছরের সাথে তুলনা করা যায় না, আর একই খরচ দুই খাতে ছড়িয়ে পড়ে।

ধাপ ২, খতিয়ান (ledger) কী এবং কীভাবে টানবেন

খতিয়ান মানে হলো প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা একটি পাতা, যেখানে ওই খাতের সব জমা ও খরচ পাশাপাশি বসে। দৈনিক বইয়ে সব খাতের লেনদেন তারিখ ধরে মেশানো থাকে, আর খতিয়ানে সেগুলো খাত ধরে আলাদা হয়ে যায়।

কাজটা সহজ। দৈনিক বই থেকে একটি একটি করে এন্ট্রি নিন, আর দেখুন সেটি কোন খাতের। ওই খাতের পাতায় গিয়ে তারিখ, বিবরণ, রশিদ বা ভাউচারের নম্বর, জমা এবং খরচ লিখুন। এক এন্ট্রি একবারই যাবে, দুবার নয়।

নমুনা পাতার গড়নটা এমন হয়:

তারিখ বিবরণ রশিদ বা ভাউচার জমা খরচ জের
০১ আগের মাসের জের ১২,৪০০
০৩ মাসিক বেতন আদায় র ১১২ ৮,৬০০ ২১,০০০
০৭ বোর্ডিংয়ের বাজার ভা ৪৫ ৬,০১০ ১৪,৯৯০

প্রতিটি খাতের জন্য এমন একটি পাতা থাকলে বছর শেষে কোন খাতে কত এল আর কত গেল, সেটি খুঁজতে হয় না, পাতাতেই লেখা থাকে।

ধাপ ৩, প্রতিটি খাতের জের বের করা

জের মানে হলো ওই খাতে এখন কত টাকা দাঁড়াল। হিসাবটা সহজ: আগের জেরের সাথে নতুন জমা যোগ করুন, তারপর খরচ বাদ দিন।

প্রতিটি খাতের পাতায় শেষ লাইনে জের বসিয়ে দিন। এরপর সব খাতের জের একসাথে যোগ করলে যে সংখ্যা আসে, সেটি হাতের নগদ ও ব্যাংকে থাকা টাকার যোগফলের সমান হওয়ার কথা।

এই দুটি না মিললে বুঝবেন কোথাও একটা এন্ট্রি বাদ পড়েছে বা দুবার উঠেছে। মেলানোর সহজ পথ হলো পার্থক্যের সংখ্যাটি নিয়ে খতিয়ানে খোঁজা। পার্থক্য যদি ঠিক কোনো একটি এন্ট্রির সমান হয়, বুঝবেন সেটি বাদ পড়েছে। পার্থক্য যদি কোনো এন্ট্রির ঠিক দ্বিগুণ হয়, বুঝবেন সেটি দুবার উঠেছে। আর পার্থক্য নয় দিয়ে ভাগ গেলে সংখ্যা লিখতে গিয়ে অঙ্ক উল্টে গেছে, যেমন ৫৪০ এর জায়গায় ৪৫০।

ধাপ ৪, নগদ ও ব্যাংক আলাদা করে মেলানো

নগদ আর ব্যাংক এক জিনিস নয়, তাই এক সাথে মেলাতে গেলে গুলিয়ে যায়। দুটি আলাদা করে নিন।

নগদের ক্ষেত্রে কাজটা সরাসরি: দিন শেষে বাক্সে বা ক্যাশে যত টাকা আছে তা গুনে ফেলুন, আর নগদ বইয়ের জেরের সাথে মিলিয়ে দেখুন। না মিললে সেদিনের এন্ট্রিগুলো একবার পড়ে যান, কারণ সমস্যাটা সেদিনেরই।

ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে বিবরণী নিন, আর নিজের খাতার পাশে রাখুন। যা মেলে তার পাশে টিক দিন। বাকি থাকা এন্ট্রিগুলো তিন ভাগে ভাগ হবে: জমা দিয়েছেন কিন্তু ব্যাংকে এখনো ওঠেনি, চেক দিয়েছেন কিন্তু কেউ ভাঙায়নি, আর ব্যাংক নিজে চার্জ কেটেছে যা আপনার খাতায় নেই। এই তিনটি আলাদা করে দেখালেই সংখ্যা মিলে যায়।

ধাপ ৫, বকেয়া ও অগ্রিম আলাদা তালিকায় রাখা

যে টাকা এখনো হাতে আসেনি সেটি আয়ের ঘরে বসালে হিসাব ফুলে যায়, আর কমিটি বাস্তবের চেয়ে বড় সংখ্যা দেখে। তাই দুটি জিনিস মূল হিসাবের বাইরে আলাদা তালিকায় রাখুন।

প্রথমটি বকেয়া, অর্থাৎ যে ফি আদায় হয়নি। এটি ছাত্র ধরে ধরে আলাদা তালিকায় থাকবে, আর যেদিন টাকা আসবে সেদিনই আয়ের খাতে বসবে। দ্বিতীয়টি অগ্রিম, অর্থাৎ শিক্ষক বা কর্মচারীকে বেতনের আগে দেওয়া টাকা। এটি খরচ নয়, কারণ পরে বেতন থেকে কাটা হবে। বেতন দেওয়ার দিন পুরো বেতন খরচে বসবে আর অগ্রিমের টাকা কেটে নেওয়া হবে।

এই দুটি গুলিয়ে ফেলা সবচেয়ে সাধারণ ভুল, আর এতেই বছরের হিসাব সবচেয়ে বেশি নড়ে যায়।

ধাপ ৬, সব খাতের ডেবিট ও ক্রেডিট একসাথে মিলিয়ে দেখা

সব খাতের জের বের হয়ে গেলে শেষ যাচাইটা করুন। প্রতিটি খাতের জের এক তালিকায় নিয়ে আসুন, বাঁ দিকে যেগুলো জমার দিক আর ডান দিকে যেগুলো খরচের দিক। দুই দিকের যোগফল সমান হলে বুঝবেন লেখায় কোনো এন্ট্রি একদিকে বসেছে অথচ অন্যদিকে বসেনি, এমন ভুল নেই। হিসাবের ভাষায় এই মিলিয়ে দেখাকেই ট্রায়াল ব্যালেন্স বলা হয়।

একটা কথা মনে রাখবেন, দুই দিক মিলে যাওয়া মানে হিসাব নির্ভুল, তা নয়। একটি টাকা ভুল খাতে বসালেও দুই দিক মিলে যাবে। তাই এই ধাপটি লেখার ভুল ধরে, বিচারের ভুল ধরে না। খাত ঠিক আছে কি না সেটা ধাপ ১ এই দেখে নেওয়ার কাজ।

ধাপ ৭, বছর বন্ধ করা ও নতুন বছরের প্রারম্ভিক জের তোলা

বছর বন্ধ করার মানে হলো একটি নির্দিষ্ট তারিখের পর ওই বছরের খাতায় আর কোনো এন্ট্রি হবে না। তারিখটা আগে থেকে ঠিক করে সবাইকে জানিয়ে দিন, নইলে হিসাব মেলানোর পরেও নতুন কাগজ আসতে থাকে।

বন্ধ করার দিনে চারটি কাজ করুন। এক, সব খাতের চূড়ান্ত জের লিখে ফেলুন। দুই, বছরের আয় ও ব্যয়ের সারসংক্ষেপ এক পাতায় তৈরি করুন। তিন, রশিদ বই, ভাউচার ও ব্যাংক বিবরণী বছরওয়ারি বাঁধাই করে রাখুন, কারণ প্রশ্ন উঠলে এই কাগজগুলোই উত্তর। চার, নতুন বছরের খাতার প্রথম পাতায় প্রারম্ভিক জের বসান, অর্থাৎ গত বছরের শেষ জেরই নতুন বছরের শুরু।

নগদ, ব্যাংক ও প্রতিটি তহবিলের জের আলাদা করে তুলুন। এক লাইনে মোট টাকা লিখে রাখলে পরের বছর কোন তহবিলে কত ছিল তা আর বের করা যায় না। কমিটিকে বছরের হিসাব দেওয়ার নিয়ম নিয়ে আলাদা লেখা আছে কমিটিকে মাসিক রিপোর্ট পাতায়।

মাদ্রাসার আয়-ব্যয় হিসাব ও তহবিল সারাংশ, ছবক সফটওয়্যারের রিপোর্ট

কোথায় ভুল হয় সবচেয়ে বেশি

নিচের পাঁচটি ভুল প্রায় প্রতিটি মাদ্রাসাতেই কোনো না কোনো বছরে হয়। প্রতিকারগুলো সহজ, শুধু নিয়ম করে মানতে হয়।

যে ভুলটি হয় যা করলে হয় না
রশিদ পরে কাটব বলে টাকা নেওয়া রশিদ ছাড়া এক টাকাও নয়, ব্যতিক্রম রাখলেই নিয়ম ভাঙে
ছাড় মুখে দেওয়া, খাতায় না লেখা ছাড়ও একটি এন্ট্রি, কে দিলেন তা লিখে রাখুন
বোর্ডিংয়ের হিসাব আলাদা খাতায় রেখে দেওয়া আলাদা তহবিল হোক, কিন্তু একই হিসাব পদ্ধতিতে
অগ্রিমকে খরচ ধরে নেওয়া অগ্রিম আলাদা তালিকায়, বেতনের দিন সমন্বয়
ভাউচার ছাড়া বাজার বা মেরামতের টাকা কাগজ না থাকলে নিজেরাই একটি ভাউচার লিখে স্বাক্ষর নিন

সংখ্যা বড় হলে কী বদলায়?

ছাত্রসংখ্যা কম আর একজন মানুষ লিখলে উপরের সাতটি ধাপ খাতাতেই ভালোভাবে চলে। কিন্তু একাধিক কর্মী আদায় করলে, একাধিক তহবিল থাকলে আর বছরে হাজারখানেক এন্ট্রি হলে হাতে খতিয়ান টানা ও জের বের করাই কয়েক দিনের কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

সফটওয়্যারে এই ধাপগুলোর হিসাবের অংশটুকু নিজে থেকেই হয়। সাধারণ খতিয়ান, দৈনিক বই ও নগদ বই আলাদা করে দেখা যায়; সব খাতের ডেবিট ও ক্রেডিট মিলিয়ে দেখা যায় হিসাব মিলছে কি না; আর নির্দিষ্ট সময়ের ব্যালেন্স শিট ও আয় ব্যয়ের হিসাব এক পাতায় পাওয়া যায়। খাত ঠিক করা, রশিদ কাটা আর ভাউচার রাখা, এই তিনটি কাজ কিন্তু তখনও মানুষকেই করতে হয়। খতিয়ান ও নগদ বই সফটওয়্যারে কীভাবে থাকে সেটি আলাদা পাতায় দেখানো আছে।

বছরের হিসাব গোছাতে চান?

আপনার তহবিল ও খাতের তালিকা বলুন, সেইভাবে সাজিয়ে ডেমোতে দেখিয়ে দেব।

সাধারণ প্রশ্ন

খতিয়ান কী এবং মাদ্রাসায় কেন লাগে?
খতিয়ান হলো প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা একটি পাতা, যেখানে ওই খাতের সব জমা ও খরচ একসাথে বসে। এটি না থাকলে বছর শেষে কোন খাতে কত এল আর কত গেল তা বের করতে পুরো দৈনিক বই আবার পড়তে হয়।
জের কীভাবে বের করব?
আগের জেরের সাথে নতুন জমা যোগ করুন, তারপর খরচ বাদ দিন। যা থাকে সেটিই ওই খাতের জের। সব খাতের জের যোগ করলে হাতের নগদ ও ব্যাংকের টাকার যোগফলের সমান হওয়ার কথা।
নগদ বই আর খতিয়ান কি আলাদা জিনিস?
হ্যাঁ। নগদ বইয়ে শুধু হাতে থাকা টাকার দৈনিক জমা ও খরচ ওঠে। খতিয়ানে প্রতিটি খাতের লেনদেন খাত ধরে আলাদা পাতায় বসে, নগদ ও ব্যাংক দুটোই।
মাসের হিসাব মিললেও বছরের হিসাব মিলছে না কেন?
সাধারণত তিনটি কারণে: মাসের শেষ দিনের জমা পরের মাসে ব্যাংকে উঠেছে, বছরের মাঝপথে নতুন খাত যোগ হয়েছে, অথবা অগ্রিম ও বকেয়া কোনো এক মাসে খরচ বা আয় হিসেবে বসে গেছে। পার্থক্যের সংখ্যাটি নিয়ে খতিয়ানে খুঁজলে জায়গাটা পাওয়া যায়।
পার্থক্য ধরার সহজ কোনো কৌশল আছে?
পার্থক্য যদি কোনো এন্ট্রির সমান হয়, সেটি বাদ পড়েছে। দ্বিগুণ হলে দুবার উঠেছে। আর নয় দিয়ে ভাগ গেলে সংখ্যা লিখতে গিয়ে অঙ্ক উল্টে গেছে, যেমন ৫৪০ এর জায়গায় ৪৫০।
খাতায় হিসাব রাখলেও কি বছর শেষে মেলানো সম্ভব?
সম্ভব, যদি খাত ঠিক থাকে, প্রতিটি টাকার বিপরীতে রশিদ বা ভাউচার থাকে আর বকেয়া ও অগ্রিম আলাদা তালিকায় থাকে। সংখ্যা বড় হলে সময় বেশি লাগে, নির্ভুলতা কমে না।

মাত্র মাসিক ৫০০ টাকায় ব্যবহার করুন মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার

English: Read about Sabaq madrasa management software in English

কল করুন হোয়াটসঅ্যাপ ফ্রি ডেমো