মাদ্রাসার বোর্ডিং ও খাবারের হিসাব কীভাবে রাখবেন
বোর্ডিংয়ের হিসাব পরিষ্কার রাখার নিয়ম চারটি: প্রতিদিন বাজার ও খরচ খাত অনুযায়ী লেখা, প্রতি বেলায় কে খেয়েছে তা লিখে রাখা, মাস শেষে মোট খরচকে মোট মিল দিয়ে ভাগ করে প্রতি বেলার রেট বের করা, আর সেই রেট দিয়ে প্রত্যেকের বিল করা। এই চারটি কাজ ঠিকমতো হলে মাস শেষে খাওয়ার বিল নিয়ে অভিভাবক বা কমিটির সামনে কখনও অস্বস্তিতে পড়তে হয় না।

এক নজরে
বোর্ডিংয়ের হিসাবে যে ছয়টি জিনিস লাগবে।
- রুম ও সিটের তালিকা, কে কোথায় থাকে
- দৈনিক বাজার খাত অনুযায়ী
- প্রতি বেলার মিল এন্ট্রি, ফুল বা হাফ
- ছুটির দিনে মিল বিরতি
- মাস শেষে প্রতি বেলার রেট
- প্রত্যেকের বিল ও রসিদ
বোর্ডিংয়ের হিসাব কেন সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ে?
মাদ্রাসার অন্য হিসাবগুলো মুলত নির্দিষ্ট। বেতন কত, ভর্তি ফি কত, তা আগেই ঠিক করা থাকে। কিন্তু খাওয়ার খরচ প্রতি মাসে বদলায়। চালের দাম বাড়লে, কক্সবাজারের মাছ মহঙ্গা হলে বা মাসের মাঝে কয়েকজন ছুটিতে গেলে পুরো হিসাব বদলে যায়। তাই মাস শেষে বিল হাতে পেয়ে অভিভাবক প্রশ্ন করেন, এত টাকা কেন।
সমস্যাটি টাকার নয়, হিসাব দেখানোর। যে প্রতিষ্ঠান প্রতিদিনের বাজার খাত অনুযায়ী লিখে রাখে আর কাগজের মেমো সঙ্গে রাখে, তারা যেকোনো প্রশ্নের উত্তর এক মিনিটে দিতে পারে। আর যারা মাস শেষে সব একসাথে লিখতে বসে, তাদের পক্ষে হিসাব মেলানো কঠিন।
প্রতি বেলার রেট কীভাবে বের করবেন?
এটিই বোর্ডিং হিসাবের মূল কথা। মাসের মোট খরচকে মাসে মোট কতটি বেলা খাওয়া হয়েছে তা দিয়ে ভাগ করলেই প্রতি বেলার খরচ বের হয়।
| বিষয় | উদাহরণ |
|---|---|
| মাসের মোট বাজার ও খরচ | ১,২০,০০০ টাকা |
| মোট মিল (সব শিক্ষার্থী মিলিয়ে) | ৪,২০০ বেলা |
| প্রতি বেলার রেট | ২৮.৫৭ টাকা |
| একজন শিক্ষার্থী খেয়েছে | ৮৫ বেলা |
| তাঁর বিল | ২,৪ৢ৫ টাকা |
এই পদ্ধতির সুবিধা হলো, যিনি বেশি খেয়েছেন তিনি বেশি দেবেন, আর যিনি ছুটিতে ছিলেন তিনি ওই দিনগুলোর টাকা দেবেন না। কারও মনে হবে না তাঁর উপর বাড়তি চাপ পড়ল।
প্রতিদিনের কাজটি কেমন হওয়া উচিত
- সকালে বাজার শেষ হলে সঙ্গে সঙ্গে খরচ লিখুন, ক্যাটাগরি অনুযায়ী (চাল, ডাল, মাছ, মাংস, সবজি, জ্বালানি)।
- কাগজের মেমো থাকলে ছবি তুলে সঙ্গে জুড়ে দিন। পরে কেউ প্রশ্ন করলে খুঁজতে হবে না।
- প্রতি বেলায় কে খেয়েছে তা বসান, ফুল না হাফ না অনুপস্থিত।
- কেউ ছুটিতে গেলে তাঁর মিল বিরতি দিয়ে রাখুন, ফিরলে আবার চালু করুন।
- মাস শেষে রেট বের করে প্রত্যেকের বিল তৈরি করুন এবং রসিদসহ বুঝিয়ে দিন।
রুম ও সিটের হিসাব কেন লাগে
অনেক প্রতিষ্ঠানে কতটি সিট খালি আছে তা মুখস্থ থাকে একজনের মাথায়। তিনি ছুটিতে গেলে নতুন ভর্তি আটকে যায়। রুম ও সিটের তালিকা লিখিত থাকলে যে কেউ দেখে বলতে পারেন কোন রুমে জায়গা আছে। আর কে কোন রুমে থাকে সেটি জানা থাকলে অভিভাবক এলে খুঁজে দিতে সময় লাগে না।
- খালি সিট কতটি, এক নজরে বোঝা যায়।
- রুম বদল করলে রেকর্ড থাকে, পরে দ্বন্দ্ব হয় না।
- কোন রুমে কতজন, তা দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও তত্বাবধানের দায়িত্ব ভাগ করা যায়।
বোর্ডিংয়ের হিসাবকে আপনার এলাকায় কী নামে ডাকা হয়?
একই কাজের নাম একেক অঞ্চলে একেক রকম। কেউ বলেন মাতবাখের হিসাব, কেউ বলেন খানার খরচ, কেউ বলেন খোরাকি, আবার কোথাও লঙ্গরখানার হিসাব বলা হয়। নাম যাই হোক, হিসাব রাখার পদ্ধতি একই: বাজারের খরচ, কতজন খেয়েছেন আর কত বেলা, এই তিনটি সংখ্যা ঠিক থাকলেই প্রতি বেলার রেট বেরিয়ে আসে।
নাম নিয়ে একটি বিষয়ে সাবধান থাকা দরকার। একই প্রতিষ্ঠানে দুজন দুই নামে লিখলে পরে মাসের হিসাব মেলানো কঠিন হয়। তাই খাতের নামটি একবার ঠিক করে সবাইকে জানিয়ে দিন, আর বছরের মাঝপথে সেটি বদলাবেন না।
কে বাজার করবেন আর কে হিসাব লিখবেন?
বোর্ডিংয়ের হিসাব নিয়ে যত কথা ওঠে, তার বড় অংশের মূলে একটি কারণ: যিনি বাজার করেন তিনিই হিসাব লেখেন। এতে কেউ অসাধু না হলেও পরে প্রশ্ন উঠলে প্রমাণ দেখানো কঠিন হয়।
সহজ সমাধান হলো দুটি কাজ দুজনের হাতে রাখা। একজন বাজার করে মেমো নিয়ে আসবেন, আর অন্য একজন সেই মেমো দেখে এন্ট্রি লিখবেন। ছোট প্রতিষ্ঠানে দুজন মানুষ না পাওয়া গেলে অন্তত এই নিয়ম করুন: মেমো ছাড়া কোনো এন্ট্রি নয়, আর মাসে একবার তৃতীয় একজন মেমো ও খাতা মিলিয়ে দেখবেন।
এন্ট্রিতে যিনি বাজার করেছেন তাঁর নাম লিখে রাখার অভ্যাস করুন। কাউকে সন্দেহ করার জন্য নয়, বরং পরে কোনো পণ্যের দাম নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কার কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে তা জানা থাকে।
বাজারের মেমোর ছবি রেখে দিলে যা সুবিধা হয়
কাগজের মেমো হারায়, ভিজে যায়, আর ছয় মাস পরে খুঁজে পাওয়া যায় না। বাজার লেখার সময়ই মোবাইলে মেমোর ছবি তুলে সঙ্গে জুড়ে দিলে এই তিনটি সমস্যাই শেষ হয়।
ছবি যত বড়ই হোক, সংরক্ষণের সময় সেটি নিজে থেকেই ছোট করে নেওয়া হয়, প্রায় নব্বই কিলোবাইটে। তাই বছরের পর বছর ছবি জমলেও জায়গা কম লাগে আর পরে দ্রুত খোলে। নিরীক্ষার সময় বা কমিটির সভায় কেউ কোনো এন্ট্রি নিয়ে প্রশ্ন করলে সঙ্গে সঙ্গে কাগজটা দেখানো যায়, আর এই একটি কাজই বোর্ডিংয়ের হিসাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি আস্থা তৈরি করে।
খাতায় রাখলে কোথায় আটকায়
| কাজ | খাতায় | সফটওয়্যারে |
|---|---|---|
| প্রতি বেলার রেট | হাতে হিসাব, ভুল হয় | নিজে থেকেই বের হয় |
| ছুটির দিনের হিসাব | মনে রাখতে হয় | মিল বিরতিতে ঠিক থাকে |
| বাজারের প্রমাণ | কাগজ হারায় | মেমোর ছবি সঙ্গে থাকে |
| প্রত্যেকের বিল | সবারটা আলাদা লিখতে হয় | একসাথে তৈরি হয় |
| লাভ না ক্ষতি | বলা কঠিন | রিপোর্টে দেখা যায় |
আপনার বোর্ডিংয়ে কতজন থাকেন?
সংখ্যা ও বর্তমানে কীভাবে বিল করেন বলুন, সেইভাবে সাজিয়ে বিনামূল্যে ডেমোতে দেখিয়ে দেব।