মাদ্রাসায় অনলাইনে বেতন নেওয়া: কী লাগে, কীভাবে শুরু করবেন
অনলাইনে বেতন নিতে তিনটি জিনিস লাগে: প্রতিষ্ঠানের নামে একটি পেমেন্ট গেটওয়ে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট, হালনাগাদ বকেয়ার তালিকা, আর অভিভাবকের জন্য একটি লগইন। এই তিনটি ঠিক থাকলে অভিভাবক রাত দুটায়ও বেতন দিতে পারেন, আর অফিসের কাজ একটুও বাড়ে না।
এক নজরে
শুরু করার আগে যা জানা দরকার।
- মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট প্রতিষ্ঠানের নিজের নামে
- টাকা যায় সরাসরি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে
- রসিদ সঙ্গে সঙ্গে, হিসাবে নিজে থেকেই
- গেটওয়ের সার্ভিস চার্জ আলাদা বিষয়
- সব অভিভাবক একসঙ্গে নয়, ধীরে ছড়ানোই ভালো
অনলাইনে বেতন নিলে আসলে কী লাভ
সবচেয়ে বড় লাভ সময়ের। মাসের প্রথম সপ্তাহে অফিসে যে ভিড় হয়, তার একটা অংশ কমে যায়। দ্বিতীয় লাভ দূরের অভিভাবক। যাঁরা প্রবাসে থাকেন বা অন্য জেলায় কাজ করেন, তাঁদের বেতন কয়েক মাস জমে যায়, কারণ সশরীরে এসে দিতে পারেন না। তৃতীয় লাভ হিসাবের। নগদ টাকা হাতে গুনতে হয় না, তাই দিন শেষে মিলাতে সময় লাগে কম।
শুরু করার আগে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হয়
বেশিরভাগ মাদ্রাসা কারিগরি জায়গায় নয়, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সিদ্ধান্তহীনতায় আটকে যায়। গেটওয়ের সাথে কথা বলার আগে নিচের চারটি বিষয় কমিটির সিদ্ধান্ত আকারে লিখে রাখুন।
- ব্যাংক হিসাব কার নামে: মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত ব্যাংক হিসাবটি প্রতিষ্ঠানের নামে হতে হবে, কোনো ব্যক্তির নামে নয়। ব্যক্তিগত হিসাবে প্রতিষ্ঠানের টাকা এলে পরে কমিটিকে জবাব দেওয়া কঠিন হয়।
- স্বাক্ষরদাতা কারা: সাধারণত দুজন স্বাক্ষরদাতা রাখা হয়, যাতে একজনের অনুপস্থিতিতেও কাজ চলে এবং একজনের হাতে সবটা না থাকে।
- মিলিয়ে দেখবেন কে: মাস শেষে গেটওয়ের হিসাব আর মাদ্রাসার খাতা কে মেলাবেন, একজনের নাম ঠিক করুন।
- অভিভাবকের প্রশ্নের জবাব কে দেবেন: টাকা কাটল কিন্তু রসিদ এল না, এমন ফোন কার কাছে যাবে সেটা আগেই ঠিক থাকা দরকার।
শুরু করার ধাপগুলো
- প্রতিষ্ঠানের নামে পেমেন্ট গেটওয়ের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলুন। সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স, প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরিচয়পত্র লাগে।
- অ্যাকাউন্ট চালু হলে স্টোরের তথ্য সফটওয়্যারে বসান।
- প্রথমে পরীক্ষামূলক মোডে চালান, নিজে একটি লেনদেন করে দেখুন রসিদ ঠিকমতো তৈরি হয় কি না।
- সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ টাকার সীমা ঠিক করুন, আর টাকা কোন তহবিলে জমা হবে বেছে নিন।
- এক দুই শ্রেণির অভিভাবকদের দিয়ে শুরু করুন, পরে বাকিদের জানান।
গেটওয়ের সাথে কথা বলার আগে যে প্রশ্নগুলো লিখে নেবেন
মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের শর্ত প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা হয়, তাই শোনা কথায় ভরসা না করে নিজে জিজ্ঞেস করে উত্তর লিখে রাখুন। পরে কমিটিকে দেখানোর সময় এই কাগজটাই কাজে লাগবে।
- আমার প্রতিষ্ঠানের ধরনে অ্যাকাউন্ট খুলতে কী কী কাগজ লাগবে?
- টাকা কত দিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়?
- প্রতিটি লেনদেনে চার্জ কীভাবে হিসাব হয়, আর কোন পদ্ধতিতে কত?
- টাকা কেটে গেলেও লেনদেন ব্যর্থ হলে সেটি কীভাবে ফেরত যায় এবং কত সময় লাগে?
- ভুল লেনদেন ফেরত দেওয়ার নিয়ম কী, কে অনুরোধ করতে পারেন?
- প্রতিদিনের ও মাসের লেনদেনের বিবরণী কোথায় পাব, ডাউনলোড করা যায় কি?
- সমস্যা হলে সাপোর্টে কীভাবে যোগাযোগ করব, বাংলায় পাওয়া যায় কি?
খরচ কার ওপর পড়বে, এটি আগেই ঠিক করুন
প্রতিটি অনলাইন লেনদেনে গেটওয়ে নিজের সার্ভিস চার্জ রাখে। এটি সফটওয়্যারের খরচ নয়, গেটওয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের চুক্তির বিষয়। প্রতিষ্ঠানকে আগেই ঠিক করতে হবে এই চার্জ প্রতিষ্ঠান নিজে বহন করবে না অভিভাবকের কাছ থেকে নেবে। যেটাই করুন, লিখিতভাবে জানিয়ে দিলে পরে অসন্তোষ তৈরি হয় না।
| বিষয় | কার দায়িত্ব |
|---|---|
| মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা | প্রতিষ্ঠান |
| লেনদেনের সার্ভিস চার্জ | গেটওয়ে ও প্রতিষ্ঠানের চুক্তি |
| সফটওয়্যারে সংযোগ ও রসিদ | ছবক, বাড়তি চার্জ নেই |
| টাকা জমা হওয়া | সরাসরি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে |
| ব্যর্থ লেনদেনের টাকা ফেরত | গেটওয়ে, তার নিজের নিয়মে |
| খাতায় সংশোধনের এন্ট্রি | প্রতিষ্ঠানের অফিস |
লেনদেন ব্যর্থ হলে বা দুবার কেটে গেলে কী করবেন
এই দুটি ঘটনা কমই ঘটে, কিন্তু ঘটলে অভিভাবক সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন। তাই উত্তরটা আগে থেকে ঠিক করা থাকলে অফিসে বিব্রত হতে হয় না।
প্রথম কথা হলো, টাকা কাটা আর লেনদেন সফল হওয়া এক জিনিস নয়। ব্যাংক বা কার্ড থেকে টাকা কাটার পরেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে লেনদেনটি অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। এমন ক্ষেত্রে টাকা সাধারণত গেটওয়ের নিজের নিয়মে ফেরত যায়, প্রতিষ্ঠানের কাছে সেটি জমাই হয় না। তাই অভিভাবককে বলুন কেটে নেওয়ার বার্তার ছবি রাখতে এবং কিছুদিন অপেক্ষা করতে।
দ্বিতীয়ত, দুবার কেটে গেলে অফিস আগে দেখবে সফটওয়্যারে দুটি রসিদ তৈরি হয়েছে কি না। একটি রসিদ থাকলে বুঝতে হবে একটিই লেনদেন সফল হয়েছে। দুটি থাকলে অতিরিক্তটি অগ্রিম হিসেবে রেখে পরের মাসের বেতনে সমন্বয় করা যায়, অথবা গেটওয়েতে ফেরতের অনুরোধ করা যায়। কোন পথে যাবেন, সেটি কমিটির সিদ্ধান্ত হিসেবে আগে লিখে রাখুন।
সন্দেহজনক কোনো লেনদেন থাকলে সেটি আটকে রাখা যায়। অফিস যাচাই করে অনুমোদন দিলে তবেই সেটি হিসাবে যুক্ত হয়, ফলে ভুল টাকা খাতায় ঢুকে পড়ে না।
হিসাবে গরমিল এড়ানোর নিয়ম
অনলাইনে দেওয়া টাকা যদি সাধারণ বেতনের রসিদ হিসেবেই সংরক্ষিত হয়, তাহলে বকেয়া, শিক্ষার্থীর খাতা ও তহবিল তিনটিই নিজে থেকে মিলে যায়। আলাদা খাতায় লিখলে দুই জায়গায় দুই রকম হিসাব তৈরি হয়, যা পরে মেলানো কষ্ট। তাই শুরু থেকেই একই হিসাবে রাখা ভালো। মাস শেষে অনলাইনে কত টাকা এল তার আলাদা রিপোর্ট দেখলেই কমিটিকে বোঝানো সহজ হয়।
মাস শেষে গেটওয়ের হিসাব আর মাদ্রাসার খাতা মেলাবেন কীভাবে?
দুটি জায়গায় দুটি সংখ্যা থাকে, আর সেগুলো হুবহু এক না হওয়াই স্বাভাবিক। কারণটা সহজ: গেটওয়ে চার্জ কেটে বাকি টাকা পাঠায়, আর মাসের শেষ দিনের লেনদেন পরের মাসে ব্যাংকে জমা হতে পারে। তাই মেলানোর কাজটা তিন ধাপে করুন।
প্রথমে সফটওয়্যার থেকে ওই মাসে অনলাইনে আদায় হওয়া টাকার তালিকা বের করুন। এরপর গেটওয়ের বিবরণী নামিয়ে একই সময়ের লেনদেনগুলো পাশে রাখুন। শেষে দুটির পার্থক্য তিনটি খাতে ভাগ করুন: গেটওয়ের চার্জ, পথে থাকা টাকা অর্থাৎ যা এখনো ব্যাংকে পৌঁছায়নি, আর ফেরত যাওয়া লেনদেন। এই তিনটির পর সংখ্যা মিলে গেলে বুঝবেন হিসাব ঠিক আছে।
মাসের রিপোর্টে অনলাইনে আসা টাকা আর অফিসে হাতে নেওয়া টাকা একসাথে দেখানোই ভালো, কারণ কমিটি মোট আদায় জানতে চায়, পথ নয়। হিসাব খাতার নিয়ম আর কমিটির রিপোর্ট নিয়ে আলাদা লেখা আছে।
অভিভাবককে কীভাবে বোঝাবেন
- প্রথমে বলুন এটি বাধ্যতামূলক নয়। চাপ দিলে আস্থা কমে।
- প্রথম মাসে যাঁরা দূরে থাকেন তাঁদের বলুন, তাঁরাই সবচেয়ে খুশি হন।
- রসিদ যে সঙ্গে সঙ্গে প্যানেলে থাকে, এটি দেখিয়ে দিন। কাগজ হারানোর ভয় থাকে না।
- প্রথম বার অফিসে বসে একজনকে দেখিয়ে দিলে তিনি অন্যদের বলেন, এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
- কোন পথে টাকা দেওয়া যাবে তা লিখিত নোটিশে জানিয়ে দিন, মুখে বললে অর্ধেক অভিভাবক জানেন না।
অনলাইন পেমেন্ট চালু করতে চান?
কীভাবে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় আর সফটওয়্যারে কী কী বসাতে হয়, ফোনেই ধাপে ধাপে বলে দেব।