মাদ্রাসার গঠনতন্ত্র: নমুনা ও লেখার নিয়ম
মাদ্রাসার গঠনতন্ত্র হলো প্রতিষ্ঠান চালানোর লিখিত নিয়ম। এতে সাধারণত থাকে নাম ও ঠিকানা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিচালনা কমিটির গঠন ও মেয়াদ, সভার নিয়ম, মুহতামিম ও শিক্ষকের দায়িত্ব, তহবিল ও ব্যাংক হিসাব, হিসাব নিরীক্ষা, সম্পদ, সংশোধন ও বিলুপ্তির ধারা। নিচে ১৫টি ধারার একটি নমুনা কাঠামো এবং বদলে নেওয়ার মতো ফ্রি Word ফাইল দেওয়া হলো।

গঠনতন্ত্র কেন দরকার?
অনেক মাদ্রাসা একজন ব্যক্তির উদ্যোগে শুরু হয় এবং তিনি যতদিন থাকেন ততদিন সব তার কথায় চলে। সমস্যা হয় তিনি না থাকলে: কে মুহতামিম হবেন, জমি কার নামে, ব্যাংকের টাকা কে তুলবেন, এ নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। গঠনতন্ত্র এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগেই লিখে রাখে। দাতারাও এমন প্রতিষ্ঠানে দান করতে স্বস্তি পান যেখানে লিখিত নিয়ম ও কমিটি আছে।
গঠনতন্ত্রের ১৫টি ধারা কী কী?
| ধারা | বিষয় | কী লেখা থাকে |
|---|---|---|
| ১ | নাম ও ঠিকানা | প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ নাম ও অবস্থান |
| ২ | প্রতিষ্ঠা ও ধরন | প্রতিষ্ঠার সাল, অরাজনৈতিক ও অলাভজনক দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান |
| ৩ | লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য | দ্বীনি শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, অসচ্ছল ছাত্রদের সুযোগ |
| ৪ | শিক্ষা ব্যবস্থা | বিভাগ, কোন বোর্ডের নেসাব, শিক্ষাবর্ষ |
| ৫ | পরিচালনা কমিটি | সদস্য সংখ্যা, পদ, মেয়াদ, শূন্য পদ পূরণ |
| ৬ | কমিটির দায়িত্ব ও ক্ষমতা | বাজেট, নিয়োগ, বড় খরচের অনুমোদন, সম্পদ রক্ষা |
| ৭ | সভা | সাধারণ সভা, কমিটির সভা, নোটিশ, কোরাম, সিদ্ধান্তের নিয়ম |
| ৮ | মুহতামিম | শিক্ষা ও দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব |
| ৯ | শিক্ষক ও কর্মচারী | নিয়োগ পত্র, বেতন, ছুটি, অব্যাহতির নিয়ম |
| ১০ | তহবিল ও আয়ের উৎস | বেতন, দান, যাকাত আলাদা তহবিল, রসিদ |
| ১১ | ব্যাংক হিসাব | কার কার যৌথ স্বাক্ষরে চলবে, হাতে কত টাকা রাখা যাবে |
| ১২ | হিসাব ও নিরীক্ষা | ভাউচার, মাসিক হিসাব, বার্ষিক নিরীক্ষা |
| ১৩ | সম্পদ | সম্পদ প্রতিষ্ঠানের নামে, ব্যক্তিগত নয় |
| ১৪ | গঠনতন্ত্র সংশোধন | কত অংশের সম্মতিতে বদলানো যাবে |
| ১৫ | বিলুপ্তি | প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে সম্পদ কোথায় যাবে |
কয়েকটি ধারার নমুনা
পুরো গঠনতন্ত্র Word ফাইলে আছে। এখানে সবচেয়ে জরুরি চারটি ধারার লেখা দেওয়া হলো, যাতে ভাষার ধরন বোঝা যায়।
ধারা ২: প্রতিষ্ঠা ও ধরন
প্রতিষ্ঠানটি …….. সালে প্রতিষ্ঠিত। এটি একটি অরাজনৈতিক, অলাভজনক দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের আয় কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
ধারা ৫: পরিচালনা কমিটি
ক) প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য …….. সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটি থাকবে।
খ) কমিটিতে সভাপতি, সহ সভাপতি, সেক্রেটারি, কোষাধ্যক্ষ ও সদস্য থাকবেন। মুহতামিম পদাধিকারবলে সদস্য হবেন।
গ) কমিটির মেয়াদ হবে …….. বছর। মেয়াদ শেষে সাধারণ সভায় নতুন কমিটি গঠিত হবে।
ঘ) কোনো পদ শূন্য হলে কমিটি বাকি মেয়াদের জন্য তা পূরণ করতে পারবে।
ধারা ১০: তহবিল ও আয়ের উৎস
ক) ছাত্রদের বেতন ও ফি, দান, চাঁদা, যাকাত, সদকা এবং অন্যান্য বৈধ উৎস।
খ) যাকাত ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে দেওয়া দান আলাদা তহবিলে রাখা হবে এবং কেবল সেই খাতেই খরচ হবে।
গ) প্রতিটি আদায় রসিদের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে।
ধারা ১৩: সম্পদ
প্রতিষ্ঠানের জমি, ভবন ও সব সম্পদ প্রতিষ্ঠানের নামে থাকবে। এগুলো কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না এবং কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না।
গঠনতন্ত্র লেখার সময় যা খেয়াল রাখবেন
- ভাষা সহজ ও স্পষ্ট রাখুন, যাতে দুই রকম অর্থ না দাঁড়ায়।
- সংখ্যাগুলো ফাঁকা রাখবেন না: কমিটির সদস্য কতজন, মেয়াদ কত বছর, কোরাম কত।
- টাকার ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে রাখবেন না। ব্যাংক হিসাবে যৌথ স্বাক্ষর রাখুন।
- যাকাত ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দান আলাদা রাখার কথা স্পষ্ট লিখুন।
- সম্পদ প্রতিষ্ঠানের নামে থাকবে, এই ধারাটি বাদ দেবেন না।
- এমন কিছু লিখবেন না যা বাস্তবে মানা সম্ভব নয়। না মানা ধারা পুরো গঠনতন্ত্রকে দুর্বল করে।
গঠনতন্ত্র তৈরি ও অনুমোদনের ধাপ
- টেমপ্লেট নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা, মুহতামিম ও দুই তিনজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বসে খসড়া তৈরি করুন।
- ফাঁকা জায়গাগুলোতে নিজেদের সিদ্ধান্ত বসান এবং অপ্রয়োজনীয় ধারা বদলে নিন।
- খসড়াটি একজন অভিজ্ঞ আলেম ও সম্ভব হলে একজন আইনজীবীকে দেখান।
- অভিভাবক, দাতা ও এলাকার মুরব্বিদের নিয়ে সাধারণ সভা ডাকুন।
- সভায় ধারাগুলো পড়ে শোনান, মতামত নিন এবং অনুমোদনের রেজুলেশন লিখুন।
- শেষ পাতায় সভাপতি, সেক্রেটারি ও মুহতামিমের স্বাক্ষর নিন।
- মূল কপি নিরাপদে রাখুন এবং কমিটির প্রত্যেক সদস্যকে একটি কপি দিন।
গঠনতন্ত্রে লেখা হিসাবের নিয়ম বাস্তবে মানবেন কীভাবে?
গঠনতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো হিসাবের ধারাগুলো: প্রতিটি আদায়ে রসিদ, প্রতিটি খরচে ভাউচার, যাকাতের টাকা আলাদা, প্রতি মাসে কমিটিকে হিসাব। কাগজে লিখে দেওয়া সহজ, প্রতিদিন মানা কঠিন। ছবক সফটওয়্যারে বেতন ও দান আদায়ের সময় রসিদ তৈরি হয় এবং আদায়টি কোন তহবিলে যাচ্ছে তা বেছে নিতে হয়, তাই তহবিলগুলো আলাদা থাকে। খরচ তোলার সময় খাত বেছে নিতে হয়, আর যেকোনো মাসের আয় ব্যয়ের রিপোর্ট প্রিন্ট করে কমিটিকে দেওয়া যায়। ফলে গঠনতন্ত্রে যা লেখা, দৈনন্দিন কাজে তা-ই ঘটে। তহবিল আলাদা রাখার নিয়ম লিল্লাহ ও জেনারেল ফান্ড লেখায় আছে, ভাউচারের নমুনা খরচের ভাউচার পাতায়, আর কমিটিকে রিপোর্ট দেওয়ার পদ্ধতি এই লেখায়।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রসিদ, তহবিল ও মাসিক হিসাব ঠিক রাখতে চান?
ছবক মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে আদায়, খরচ, তহবিল ও কমিটির রিপোর্ট একই জায়গায় থাকে। ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপে জানালে আমরা বিনামূল্যে ডেমো দেখিয়ে দিই।