লিল্লাহ ফান্ড ও জেনারেল ফান্ড আলাদা রাখবেন কীভাবে: খাত ভাগ, রশিদ ও দাতাকে রিপোর্ট

দুটি ফান্ড আলাদা রাখার কাজটা শুরু হয় রশিদ বই থেকে, খাতা থেকে নয়। দুই ফান্ডের জন্য দুটি আলাদা রশিদ সিরিজ, খাতায় দুটি আলাদা খতিয়ান পাতা, আর মাস শেষে দুটি আলাদা জের। এই তিনটি ঠিক থাকলে দাতা প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে কাগজ খুঁজতে হয় না।

এক নজরে

আলাদা রাখার পাঁচটি কাজ।

  • দুই রশিদ সিরিজ, রশিদে ফান্ডের নাম
  • দুই খতিয়ান পাতা, দুই জের
  • খরচের তালিকা আগে লিখিতভাবে ঠিক
  • দাতাকে এক পাতার হিসাব
  • কমিটির সামনে দুই কলাম
এই লেখাটি হিসাব রাখার পদ্ধতি নিয়ে, কোন টাকা শরিয়তের দৃষ্টিতে কোথায় ব্যয় করা যাবে সেই মাসআলা নিয়ে নয়। যাকাত, সদকা, ফিতরা ও কাফফারার ব্যয়ের বিধান নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন আপনার প্রতিষ্ঠানের মুফতি সাহেব বা দায়িত্বশীল আলেম। এখানে শুধু বলা হয়েছে সিদ্ধান্তটি নেওয়ার পর সেটি খাতায় কীভাবে বসাবেন।

মাদ্রাসায় সাধারণত কোন কোন ফান্ড থাকে?

বেশিরভাগ মাদ্রাসায় দুটি প্রধান ফান্ড থাকে। জেনারেল ফান্ড, যেখানে সাধারণ আয় ও সাধারণ খরচ চলে। আর লিল্লাহ ফান্ড, যাকে অনেক জায়গায় লিল্লাহ বোর্ডিং বলা হয়, যেখানে গরিব ও এতিম ছাত্রদের খাওয়া থাকার খরচ চলে।

এর বাইরে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও তহবিল রাখা হয়, যেমন নির্মাণ তহবিল, মাহফিল তহবিল বা কিতাব তহবিল। সংখ্যা যত কম রাখা যায় ততই ভালো, কারণ প্রতিটি তহবিলের জন্য আলাদা রশিদ, আলাদা খতিয়ান ও আলাদা জের রাখতে হয়। কোন কোন তহবিল রাখবেন তা কমিটির সিদ্ধান্তে বছরের শুরুতেই ঠিক করে নিন।

কোন টাকা কোন ফান্ডে যায়?

নিচের ছকটি বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে যে ভাগটি সাধারণত প্রচলিত, সেটি দেখাচ্ছে। আপনার প্রতিষ্ঠানের নিয়ম এর চেয়ে আলাদা হতে পারে, আর সেটিই চূড়ান্ত। ছকটি ধরে একবার নিজেদের তালিকা বানিয়ে দেয়ালে টাঙিয়ে দিলে অফিসের সবাই একই নিয়মে লিখবেন।

যে টাকা আসে সাধারণত যে ফান্ডে
ছাত্রের মাসিক বেতন ও ভর্তি ফি জেনারেল ফান্ড
সাধারণ দান ও এলাকার মাসিক চাঁদা জেনারেল ফান্ড
যাকাত লিল্লাহ ফান্ড
সদকা ও ফিতরা লিল্লাহ ফান্ড
মান্নত ও কাফফারা লিল্লাহ ফান্ড
কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা লিল্লাহ ফান্ড
নির্দিষ্ট ছাত্রের জন্য স্পনসরের টাকা লিল্লাহ ফান্ড, ছাত্রের নামে আলাদা তালিকায়
নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট দান নির্মাণ তহবিল

একটি কথা মনে রাখা দরকার। দাতা যদি টাকা দেওয়ার সময় বলে দেন এটি কোন খাতের, তাহলে সেটিই মানতে হবে। তাই রশিদ কাটার সময় দাতাকে জিজ্ঞেস করে নিন, আর রশিদে লিখে রাখুন। পরে অনুমান করে ভাগ করলে সেটাই সবচেয়ে বড় ভুল হয়।

প্রথম কাজ, রশিদ বইয়ের আলাদা সিরিজ

যে মাদ্রাসা এখনো পুরোপুরি কাগজে চলে, সেও এই কাজটি আজই শুরু করতে পারে। খরচ প্রায় নেই, অথচ ফল সবচেয়ে বেশি।

  • দুই ফান্ডের জন্য দুটি আলাদা রশিদ বই ছাপান, দুই রঙে হলে ভুল হওয়ার সুযোগ আরও কমে
  • রশিদের উপরে ফান্ডের নাম ছাপা থাকুক, হাতে লেখা নয়
  • ক্রমিক নম্বরের সিরিজ আলাদা রাখুন, যাতে দুই বইয়ের নম্বর কখনো এক না হয়
  • কে কোন বই ব্যবহার করবেন তা ঠিক করে দিন, দুই বই এক জনের হাতে থাকলে তাড়াহুড়ায় ভুল বই থেকে রশিদ কাটা হয়
  • বাতিল রশিদ ছিঁড়ে ফেলবেন না, বইতেই রেখে দিন, ক্রম যেন ভাঙে না

রশিদ নিয়ে বিস্তারিত নিয়ম আছে চাঁদা ও দান আদায়ের রশিদ লেখাটিতে।

খাতায় আলাদা খতিয়ান পাতা রাখা

রশিদ আলাদা হলে খাতাও আলাদা হতে হবে, নইলে দুই ফান্ডের টাকা এক জায়গায় মিশে যায়। প্রতিটি ফান্ডের জন্য খতিয়ানে নিজস্ব পাতা রাখুন, যেখানে ওই ফান্ডের সব জমা ও খরচ বসবে এবং নিজস্ব জের বেরোবে।

মাস শেষে দুটি পাতা আলাদা করে মিলিয়ে দেখুন। দুই জেরের যোগফল হাতের নগদ ও ব্যাংকে থাকা টাকার সমান হওয়ার কথা। না মিললে বুঝবেন কোনো এক এন্ট্রি ভুল পাতায় গেছে। খতিয়ান টানা ও জের বের করার পুরো পদ্ধতি আছে জের মেলানোর সাত ধাপ লেখাটিতে।

ব্যাংকের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে দুই ফান্ডের জন্য দুটি হিসাব রাখুন। একটি হিসাবেই রাখতে হলে খাতায় অবশ্যই আলাদা রাখুন, আর ব্যাংকে জমা দেওয়ার সময় স্লিপে ফান্ডের নাম লিখে দিন।

লিল্লাহ ফান্ডের টাকা কোন খরচে বসে

কোন খরচ কোন ফান্ড থেকে যাবে, সেটি বছরের শুরুতে একবার লিখিতভাবে ঠিক করে নিন এবং কমিটির খাতায় তুলে রাখুন। প্রতিবার সিদ্ধান্ত নিতে গেলে একেক সময় একেক রকম হয়, আর তখনই হিসাব ঘোলাটে হয়।

প্রচলিত ভাগটি সাধারণত এমন: গরিব ও এতিম ছাত্রদের খাবার, থাকার খরচ, চিকিৎসা, কিতাব ও পোশাক লিল্লাহ ফান্ড থেকে; আর শিক্ষকের বেতন, বিদ্যুৎ, মেরামত ও অফিসের খরচ জেনারেল ফান্ড থেকে। মাঝামাঝি কিছু খরচ থাকে, যেমন বোর্ডিংয়ের রান্নার লোকের বেতন বা গ্যাসের খরচ। এগুলো কোথায় বসবে তা আগেই ঠিক করে নিন, আর একবার ঠিক করলে বছরজুড়ে সেটাই মানুন।

বোর্ডিংয়ের প্রতিদিনের বাজার ও খাবারের হিসাব রাখার আলাদা পদ্ধতি আছে, সেটি নিয়ে লেখা আছে বোর্ডিং ও খাবারের হিসাব পাতায়।

দাতাকে ও স্পনসরকে যে এক পাতার হিসাব দেবেন

যিনি টাকা দিয়েছেন তিনি জানতে চান টাকাটা কোথায় গেল। এক পাতার একটি হিসাব তৈরি রাখলে সেই প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া যায়, আর দাতা পরের বছরও দেন।

  • প্রাপ্তির তারিখ ও রশিদ নম্বর: কবে কত টাকা পাওয়া গেছে
  • কোন ফান্ডে জমা: লিল্লাহ না নির্মাণ, স্পষ্ট করে
  • কোন খাতে ব্যয়: খাবার, কিতাব, চিকিৎসা, এভাবে ভাগ করে
  • কতজন উপকৃত: সংখ্যা, নাম নয়
  • জের: এখনো কত টাকা অব্যয়িত আছে

একটি বিষয়ে সাবধান থাকুন। এতিম বা গরিব ছাত্রের নাম, ছবি বা পারিবারিক অবস্থার বিবরণ দাতাকে দেওয়া রিপোর্টে বা প্রচারপত্রে না দেওয়াই ভালো। সংখ্যা ও খাত দিয়ে হিসাব সম্পূর্ণ বোঝানো যায়। ছাত্রের মর্যাদা রক্ষা করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। স্পনসর যদি নির্দিষ্ট ছাত্রের খোঁজ চান, তাহলে ছাত্রের অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে তবেই তথ্য দিন।

কমিটির সামনে দুই ফান্ড কীভাবে দেখাবেন

কমিটির সভায় দুই ফান্ড আলাদা কলামে দেখান, একসাথে যোগ করে একটি সংখ্যা নয়। এক পাতায় চারটি লাইন থাকলেই যথেষ্ট।

বিবরণ জেনারেল ফান্ড লিল্লাহ ফান্ড
প্রারম্ভিক জের বছরের শুরুতে যা ছিল বছরের শুরুতে যা ছিল
বছরের আয় খাত ধরে মোট খাত ধরে মোট
বছরের ব্যয় খাত ধরে মোট খাত ধরে মোট
সমাপনী জের বছরের শেষে যা আছে বছরের শেষে যা আছে

এই চার লাইনের নিচে খাতভিত্তিক বিস্তারিত রাখুন। কমিটি প্রশ্ন করলে বিস্তারিত অংশটি দেখাবেন, আর সাধারণভাবে চার লাইনেই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

কোথায় ভুল হয় সবচেয়ে বেশি

যে ভুলটি হয় যা করলে হয় না
এক রশিদ বই দিয়ে দুই ফান্ডের টাকা নেওয়া দুই বই, দুই সিরিজ, রশিদে ফান্ডের নাম ছাপা
এক ব্যাংক হিসাবে দুই ফান্ড মিশে যাওয়া সম্ভব হলে দুই হিসাব, নইলে খাতায় কড়াভাবে আলাদা
জেনারেলে টান পড়লে লিল্লাহর টাকা সাময়িকভাবে নেওয়া এটি করবেন না; করতেই হলে কমিটির সিদ্ধান্তে ও লিখিতভাবে, আর নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত
দাতাকে কোনো হিসাব না দেওয়া বছরে অন্তত একবার এক পাতার হিসাব পাঠানো
দাতা কোন খাতে দিয়েছেন তা না লেখা রশিদ কাটার সময়েই জিজ্ঞেস করে লিখে রাখা

সংখ্যা বড় হলে কী বদলায়?

দুটি ফান্ড আর কয়েকশ রশিদ পর্যন্ত খাতাতেই ভালো চলে। তহবিল তিন চারটি হয়ে গেলে আর বছরে হাজারখানেক রশিদ হলে প্রতিটি তহবিলের জের হাতে বের করাই কয়েক দিনের কাজ।

সফটওয়্যারে বেতন, চাঁদা, দান, সদকা ও অন্যান্য আয় আলাদা খাতে লেখা যায়, আর প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা রিপোর্ট বের হয়। খতিয়ান, দৈনিক বই ও নগদ বই আলাদা করে দেখা যায়, তাই কোন তহবিলে কত এল আর কত গেল তা বছরের যেকোনো দিন এক পাতায় পাওয়া যায়। তবে দাতা কোন খাতে দিচ্ছেন তা জিজ্ঞেস করে রশিদে লেখা, আর কোন খরচ কোন ফান্ড থেকে যাবে তা ঠিক করা, এই দুটি কাজ তখনও মানুষকেই করতে হয়। খাত ভিত্তিক আয় ও ব্যয় আলাদা রাখা কীভাবে হয় তা আলাদা পাতায় দেখানো আছে।

তহবিলের হিসাব গোছাতে চান?

আপনার মাদ্রাসায় কয়টি ফান্ড আছে বলুন, সেইভাবে সাজিয়ে ডেমোতে দেখিয়ে দেব।

সাধারণ প্রশ্ন

মাদ্রাসায় লিল্লাহ ফান্ড ও জেনারেল ফান্ড আলাদা রাখতে হয় কেন?
কারণ দুই ফান্ডের টাকার উৎস আলাদা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রও আলাদা। মিশে গেলে দাতাকে হিসাব দেওয়া যায় না, আর কোন টাকা কোথায় ব্যয় হলো তা পরে বের করা যায় না। শরিয়তের দিক থেকে ব্যয়ের বিধান কী, সেটি প্রতিষ্ঠানের মুফতি সাহেব ঠিক করে দেবেন।
যাকাতের টাকা সাধারণত কোন ফান্ডে রাখা হয়?
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মাদ্রাসায় যাকাত, সদকা, ফিতরা ও কাফফারার টাকা লিল্লাহ ফান্ডে রাখা হয়, যেখান থেকে গরিব ও এতিম ছাত্রদের খাওয়া থাকার খরচ চলে। আপনার প্রতিষ্ঠানের নিয়ম আলাদা হলে সেটিই চূড়ান্ত, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন দায়িত্বশীল আলেম।
দুই ফান্ডের জন্য কি আলাদা রশিদ বই লাগবে?
হ্যাঁ, এটিই সবচেয়ে জরুরি কাজ। দুটি আলাদা বই, আলাদা ক্রমিক সিরিজ, আর রশিদের উপরে ফান্ডের নাম ছাপা থাকা উচিত। এক বই দিয়ে দুই ফান্ডের টাকা নিলে পরে আর আলাদা করা যায় না।
দাতাকে হিসাব দেখাতে কী কী কাগজ লাগে?
এক পাতায় প্রাপ্তির তারিখ ও রশিদ নম্বর, কোন ফান্ডে জমা হয়েছে, কোন কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, কতজন উপকৃত হয়েছেন এবং কত টাকা এখনো অব্যয়িত আছে, এটুকু থাকলেই যথেষ্ট।
এতিম ছাত্রের স্পনসরকে কী রিপোর্ট দেওয়া উচিত?
খাতভিত্তিক ব্যয় ও উপকৃত ছাত্রের সংখ্যা দিয়ে রিপোর্ট দিন। ছাত্রের নাম, ছবি বা পারিবারিক অবস্থার বিবরণ না দেওয়াই ভালো। স্পনসর নির্দিষ্ট ছাত্রের খোঁজ চাইলে অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে তবেই তথ্য দিন।
জেনারেল ফান্ডে টান পড়লে লিল্লাহর টাকা সাময়িকভাবে নেওয়া যাবে?
হিসাবের দিক থেকে এটি এড়ানোই ভালো, কারণ ফেরত দিতে দেরি হলে দুই ফান্ডের জের আর মেলে না। একান্তই করতে হলে কমিটির সিদ্ধান্তে, লিখিতভাবে এবং নির্দিষ্ট তারিখে ফেরতের শর্তে। শরিয়তের দিকটি নিয়ে দায়িত্বশীল আলেমের পরামর্শ নিন।

মাত্র মাসিক ৫০০ টাকায় ব্যবহার করুন মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার

আমাদের আর্টিকেল শেয়ার করুন
Facebook
WhatsApp

মাত্র মাসিক ৫০০ টাকায় ব্যবহার করুন মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার

English: Read about Sabaq madrasa management software in English

কল করুন হোয়াটসঅ্যাপ ফ্রি ডেমো